সোমবার ১৪ অক্টোবর ২০১৯
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » অপরাজিত সৈনিক ‘ভাষা মতিন’ এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ



অপরাজিত সৈনিক ‘ভাষা মতিন’ এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
08.10.2019

নিউজ ডেস্ক: দেশের ভেতরে সারাজীবন কাজ করে যাওয়া শ্রেণি সংগ্রামের একজন রাজনীতিবিদ কমরেড আবদুল মতিন। ‘ভাষা মতিন’ নামে সর্বাধিক পরিচিত এই মানুষটির জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর। তার জীবনাসন হয় ২০১৪ সালের আজকের এই দিনে ( ৮ অক্টোবর)।

তিনি জন্মেছিলেন সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ধুবুলিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম আবদুল জলিল, মা আমেনা খাতুন।

পরিবারের সকল জমিজমা যমুনার গর্ভে বিলীন হলে তারা সপরিবারে দার্জিলিং চলে আসেন। সেখানে এন্ট্রান্স অর্থাৎ বর্তমানের এসএসসি পাশ করেন। ১৯৪৫ সালে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর অব আর্টসে।

‘ভাষা মতিন’ নামটি আবদুল মতিন অর্জন করেন ভাষা আন্দোলনে তার অনন্য সাধারণ ভূমিকার জন্য। ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে ইতিহাস রচিত হয়েছে।

তাকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন তার ভাষণে ‘উর্দু কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে উচ্চারণ করেছিলেন ঠিক সে সময় মতিন দাঁড়িয়ে সে ভাষণের তীব্র প্রতিবাদ করেন। সে ঘটনাকে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য বলা যায়।

এই একটি ঘটনার মাধ্যমে মতিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের এক প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় সচিবালয়ের কাছ থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে এবং দুই মাসের আটকাদেশ দিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

দুই মাসের জেল জীবন শেষ হওয়ার পর ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। এরপরেও তিনি চারবার (১৯৫২-৫৩, ১৯৬২-৬৫, ১৯৭২-৭৭, ১৯৮৬) গ্রেফতার হন এবং জেলে অবস্থান করেন।

১৯৪৮ সালে গঠিত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মতিন। এই কমিটি ভাষার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করত। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি। ওই জনসভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তাদের পরিষদ শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল।

এরপরের ঘটনা সবার জানা। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়। কেউ গ্রেফতার হন, আবার আত্মগোপনে যান অনেকে।

২১ ফ্রেব্রুয়ারিতে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ভাষা আন্দোলনকারী থেকে বের হয়ে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসেন। ১৯৫২ সালের মার্চে গঠিত হওয়া পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক হন আবদুল মতিন ও মোহাম্মদ তোয়াহা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আবদুল মতিনের সরব উপস্থিতি ছিল বরাবরই। ১৯৬৬ সালে নিযুক্ত হন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক হিসেবে। ১৯৬৯ সালে সে পার্টিরই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। এখানে তিনি দায়িত্বে ছিলেন ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত।

পাবনা শহরকে মুক্ত করা এবং সশস্ত্র যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি শ্রেণিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭২ সালের ৪ জুন ‘আত্রাই লড়াই’ খ্যাত সশস্ত্র যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ অবস্থার গ্রেফতার হন আবদুল মতিন। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর মুক্তি পান ১৯৭৭ সালে। এরপর বিভিন্ন সময় বেশ কিছু দলের সাথে যুক্ত হয়ে সরাসরি কাজ করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে নবগঠিত বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগে কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। আমৃত্যু তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।

মস্তিষ্কে স্ট্রোক হওয়ায় দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর আবদুল মতিনের বর্ণিল জীবনের অবসান হয়।

তিনি একটি পতাকার জন্য যুদ্ধ করেননি, তার যুদ্ধ ছিল জনগণের মুক্তির জন্য। তার জীবনে কোনো সুবিধাবাদ নেই, মৃত্যুর পর দেহ এবং চোখ দান করে যান জনগণের জন্য।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি