বুধবার ১৩ নভেম্বর ২০১৯



সরব হচ্ছেন বীরাঙ্গনারা: দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
07.11.2019

নিউজ ডেস্ক: অস্ত্র হাতে যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সেইসব মুক্তিযোদ্ধার কথা ইতিহাসের অগ্রভাগে থাকলেও এই নারীদের লড়াইয়ের কথা থেকে গেছে অন্তরালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃত পাওয়া এই নারীদের লড়াইয়ের আখ্যান ‘রাইজিং সাইলেন্স’। ৫ নভেম্বর লন্ডনে প্রদর্শিত হয়েছে এই তথ্যচিত্রটি। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রদর্শিত ওই তথ্যচিত্র নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার হওয়া কয়েকজন নারীর নিজস্ব বয়ান। তথ্যচিত্রে যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে তাদের বঞ্চনা আর ক্ষতগুলো নিয়ে সরব হয়েছেন তারা।

‘রাইজিং সাইলেন্স’ বীরাঙ্গনা নারীদের যুদ্ধ পরিভ্রমণের গল্প। যারা যুদ্ধ যাপন করেছেন, এর হিংস্রতা আর ভয়াবহতাকে নিজেদের যাপিত জীবনের মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করেছেন, যুদ্ধ-পরবতী সময়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও নিজেদের ক্ষতকে আড়ালে রেখে সুন্দর আগামী গড়তে তৎপর হয়েছেন সেইসব নারীই সরব হয়েছেন ওই তথ্যচিত্রে। ছবিটি প্রযোজনা করেছে লন্ডনভিত্তিক সংগঠন কমলা কালেকটিভ, ওপেনভাইজার ও মেকিং হার স্টোরি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তথ্যচিত্রের চার বোন আমিনা, মালেকা, মোখলেসা ও বুহদি বেগমের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। নয় মাসের মুক্তির সংগ্রামের সময় পাকিস্তানি সেনারা যে দুই লাখ নারীকে ক্যাম্পে আটক রেখে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার যৌন নিপীড়ন করে তাদের মধ্যে ছিলেন এই চার বোনও। ক্যাম্পে তাদের আড়াই মাস আটক রাখা হয়েছিল।

মালেকা বেগম ক্যাম্পের বিভৎস অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তথ্যচিত্রে বলেছেন, আমাদের মধ্যে ২২ জন রুমটিতে মরার মতো শুয়ে থাকতাম। তিনি জানান, ‘যন্ত্রণা সইতে না পেরে’ মুক্তি পাওয়ার পূর্বে তার বোন বুহদি মারা যায়। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মালেকা-মোখলেসা। ঘটনার চার দশক পরে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা লীসা গাজীকে তারা দেখিয়েছেন নৃশংস নির্যাতনের সেই ঘটনাস্থল। কীভাবে সেনারা নারীদের সঙ্গে যা ইচ্ছে করত এবং মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো তা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন তারা।

কিশোরি বয়সে তিনি প্রথম ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটি শোনেন। সে সময় তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করেন যে, এই বীরাঙ্গনা নারীদের কথা তাদের ইতিহাস বইয়ে লেখা ছিল না। কিন্তু তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি ট্রাক বোঝাই নারীদের দেখেছিলেন। তার বাবার স্মৃতি থেকে সেটা লিসা নিজে শুনেছেন। আর তখনই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আরও বেশি করে জানবেন এই নারীদের সম্পর্কে।

বাবার কাছেই লিসা জেনেছিলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে এই বীর নারীদের ‘ওয়ার হিরোইন’ তথা বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের পরে যে নারীদের তার পরিবার নিতে চায়নি, তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালে তিনি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মুখে ওই কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নারীদের নির্যাতনের আখ্যানগুলোও চলে যায় ইতিহাসের অন্তরালে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে তাদেরকে লজ্জা, বিচ্ছিন্নতা এবং বৈষম্য নিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। তাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও মুখোমুখি হতে হয় নেতিবাচক অভিজ্ঞতার। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লিসা গাজী ২০১০ সালের দিকে কমলা কালেকটিভের পক্ষে (ব্রিটেনভিত্তিক থিয়েটার ও আর্ট কোম্পানি, যারা নারীদের জবানিতে তাদের অকথিত গল্প রেকর্ড করে থাকে) ৮০ জনের বেশি বীরাঙ্গনার সাক্ষাতকার নেন। বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে তার আলোচনাগুলোর ভিত্তিতেই নির্মিত হয়েছে ‘রাইজিং সাইলেন্স’। তাদের অনেকেই এতোদিনে বেঁচে নেই। এই নারীদের অভিজ্ঞতার বিবরণী বিংশ শতাব্দীর প্রথম লিখিত ইতিহাস, যেখানে যুদ্ধে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এই নারীদের অনেকেই দরিদ্র এবং জরাগ্রস্ত। বেশিরভাগই তাদের জীবিকা, সন্তান, বাবা-মা বা স্বামীকে হারিয়েছে। কিন্তু লিসার কাছে এসব বিষয় মুখ্য ছিল না। তার উদ্বেগের বিষয় ছিল এই বীরাঙ্গনারা তাদের গল্প বলার আগেই মারা যাচ্ছে। ফলে তিনি ব্রিটেন থেকে দেশে ফিরে আসেন ক্যামেরা নিয়ে।

লন্ডনের আগে চলচ্চিত্রটি দেখানো হয়েছে বাংলাদেশ, আইসল্যান্ড, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসে। ঢাকা থেকে মুনড্যান্সের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মাননা পেয়েছে। এ সম্মাননার সর্বশেষ সংযোজন এশিয়ান মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস। লিসা মনে করেন, আমরা যদি ঐতিহাসিক যৌন সহিংসতাকে এড়িয়ে যাই বা বাতিলের খাতায় ফেলে দেই, তাহলে কোনোদিন তা বন্ধ হবে না। তিনি বলেন, আমাদের মনোযোগ দিতে হবে এবং নিপীড়নে জীবিতদের ঘটনা শুনতে হবে।

মিয়ানমার ও দক্ষিণ সুদানের কথা তুলে ধরে লিসা বলেন, ‘প্রায় ৫০ বছর পূর্বে, দূরের একটি দেশের ভুলে যাওয়ার যুদ্ধের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আমাদের তাদের বক্তব্য খারিজ করে দিতে পারি। কিন্তু সমস্যা হলো আজকের দিনেও সশস্ত্র সংগ্রামে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণকে একইভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ তিনি মনে করেন, সমাজ পাশে না থাকলেও নির্যাতনের শিকার ওই নারীরা তখন নিজেরা একে অপরের পাশে ছিলেন। এই বীরাঙ্গনা নারীদের বাস্তবতা উন্মোচন করতে গিয়ে নিজেই একটি প্রশ্নের মুখে পড়েছেন লিসা। তার কথায়, ‘মাঝে-মধ্যেই আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি, কী করে একজন নারীর শরীর এতবেশি পরিমাণে ঘৃণা এবং এতটা বেশি সহিংসতা উসকে দিতে পারে?’

লিসা ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মধ্যে একটি ছক দেখেছেন। বলেছেন, ‘আমরা যদি কোনও পরিবারকে লজ্জায় ফেলতে চাই, তাহলে আমরা তাদের কন্যাসন্তানদের দিকে নজর দেবো। আমরা যদি একটা কমিউনিটিকে লজ্জায় ফেলতে চাই, তখন আমরা তাদের কন্যাদের দিকে তাকাব। আমরা যদি একটি দেশকে লজ্জায় ফেলতে চাই, আমরা তাদের কন্যাদের দিকেই তাকাব। এটা সেই এক মনোগঠন, যা যুদ্ধ এবং সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রবহমান। আমাদেরকে অবশ্যই তা বন্ধ করতে হবে।’

লিসা গাজীর দাবি, ধর্ষণ নয়, তার তথ্যচিত্রটি সেইসব নারীর গল্প, যারা শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। নিষ্ঠুরতম শারীরিক ও মনোগত নির্যাতন এবং রক্তক্ষরণের বিরুদ্ধে নিজেকে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড় করিয়েছেন। নারীদের দুঃখ দুর্দশার চিত্র নয়, এটি এটা হলো সেই সব নারীর বেঁচে থাকার উপাখ্যান যারা অপমান ও অবহেলাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি তাদের গল্প, যারা কথিত কলঙ্ক আর ধর্ষণের কারণে যে লজ্জা আরোপ করে সমাজ, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার সংকল্পে স্থির থেকেছেন।

মোখলেসা বেগম লিসাকে ঠাকুরগাঁও জেলায় একটি ‘খুনি পুকুর’ দেখিয়েছেন। বলেছেন, এটিকে যুদ্ধের সময় রক্তে লাল হয়ে যেতে দেখেছেন তারা। এখানে দুই হাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ রাখা হয়েছিল। তিনি সরব স্মৃতিচারণ করেন, ‘আমরা এখান থেকে চারজন মানুষকে বাঁচাতে পেরেছিলাম। বাংলাদেশ থেকে মানুষ হারিয়ে যাচ্ছিল। হিন্দু-মুসলিম কিংবা সাঁওতাল, আমরা সবাইকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছি। দেশকে মুক্ত করতে হয়েছে আমাদের’।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি