সোমবার ৬ এপ্রিল ২০২০



ধনাঢ্যদের ব্ল্যাকমেইল করত শামিমা


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
24.02.2020

নিউজ ডেস্ক: ভয়ঙ্কর সব অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউর কাছ থেকে গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত অনেক ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করেছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। গোপন ক্যামেরায় মেয়েদের সঙ্গে ধনাঢ্য ও প্রভাবশালীদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাদের নিয়মিতভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন তিনি। পাপিয়ার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়- পাপিয়া বসে আছেন বাইজিবাড়ির সর্দারনির মতো। তার হাতে মোটা একটি বেতের লাঠি। তার কব্জায় থাকা মেয়েরা কথা না শুনলে পেটাতেন। পাপিয়া একাধিক অভিজাত হোটেলের রুম ভাড়া নিতেন নামে-বেনামে। সর্বশেষ গতকাল পর্যন্ত একটি হোটেলের প্রেসিডেনশিয়াল স্যুটে তার নামে পাওয়া গেছে। এই পাঁচ তারকা হোটেলে বিভিন্ন মেয়েকে পাপিয়া নিজেই নিয়ে যেতেন।

যুব মহিলা লীগের পদ বাগিয়ে অভিজাত এলাকায় জমজমাট নারী ব্যবসাসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। নিজেকে পরিচয় দিতেন ক্ষমতার রাঘববোয়ালদের কর্মী হিসেবে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গিয়ে নেতাদের ফুল দিয়ে সেই ছবিরও অপব্যবহার করতেন তার সব খারাপ কাজে। শুধু গত এক মাসেই এই নারী রাজধানীর অভিজাত এক পাঁচ তারকা হোটেলে বিশাল অঙ্কের বিল পরিশোধ করেছেন। আর এ অর্থ খরচের কারণেই গোয়েন্দাদের চোখ পড়ে পাপিয়ার ওপর। একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে তার সব অপকর্মের কাহিনি।

আলোচিত এই নারী হচ্ছেন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাাদক। তিনি নিজেকে কেন্দ্রীয় নেত্রী হিসেবেও পরিচয় দিতেন। সর্বশেষ প্রচার করতেন সংরক্ষিত এমপি পদ পাচ্ছেন। কিন্তু তা না পেলেও থেমে ছিল না তার অপরাধমূলক কাজকর্ম। গতকাল সকালে স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন, সাবিক্ষর খন্দকার (২৯), শেখ তায়্যিবা (২২) সহ আরও দুজন বিদেশে যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে আটক করেছে র‌্যাব। শুরুতে পাপিয়া প্রথমে নিজের দাপুটে অবস্থানের পরিচয় দেন। তবে কোনো কিছুতে গুরুত্ব না দিয়ে পাপিয়ার কাছ থেকে র‌্যাব কর্মকর্তারা উদ্ধার করতে থাকেন অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা গেছে, এই পাপিয়া হেন অপকর্ম নেই, যার সঙ্গে জড়িত নন। পাঁচ তারকা হোটেলে নারী ও মাদক ব্যবসাই তার আয়ের মূল উৎস। দেশের অভিজাত কিছু মানুষ ও বিদেশিরাই এর গ্রাহক। ইন্টারনেটে স্কট সার্ভিস খুলে বসে খদ্দেরদের কাছে তাদের চাহিদামতো সুন্দরী তরুণী পাঠাতেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষিত সুন্দরী তরুণীদের সংগ্রহ করতেন। একপর্যায়ে তাদেরকে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য করতেন পাপিয়া।

গত ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ৫৯ দিন প্রেসিডেনশিয়াল স্যুট ভাড়া ছিল পাপিয়ার নামে। ওই ৫৯ দিনে তিনি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা নগদ (ক্যাশ) পরিশোধ করেছেন।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফি উল্লাহ বুলবুল জানান, তার বার্ষিক আয় ১৯ লাখ টাকা হলেও পাপিয়া গত তিন মাসে শুধু একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছেন! এ ছাড়া তার নামে একটি হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট সব সময় বুকড থাকত। ওই হোটেলেই তার নিয়ন্ত্রণে ছিল সাতটি মেয়ে।

সুমন ও পাপিয়ার উত্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, ২০০০ সালের দিকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু সুমনের। পরবর্তীতে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের আহবায়ক নির্বাচিত হন। রাজনীতির পাশাপাশি শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন।

২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন তিনি। হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ওপর ভর করেই অপরাধ জগতে তাঁর উত্থান। এরই মধ্যে আট বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের পর পাপিয়াকে ২০১২ সালে বিয়ে করেন সুমন।

বিয়ের পরপরই ২০১৩ সালে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন এই দম্পত্তি। সেই হামলায় পাপিয়া গুলিবিদ্ধ হন। পরে তারা নরসিংদী ছেড়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে ঢাকার সাবেক এক সাংসদের সঙ্গে (সাবিনা আক্তার তুহিন) তাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নিজস্ব কৌশলে পাপিয়াকে জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক বানান সুমন। কিন্তু নরসিংদীতে তাদের পদচারণা নেই বলতে গেলেই চলে।

সম্প্রতি নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগ দুই ধারায় বিভক্ত। এর এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম ও অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঞা। দলীয় কোন্দলের সুযোগে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদরের সাংসদ নজরুল ইসলামের বলয়ে যোগ দেন সুমন ও পাপিয়া।

নিজেদের জানান দিতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে মো. নজরুল ইসলামের পক্ষে সুমন ও পাপিয়ার নেতৃত্বে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে বিশাল শোডাউন করেন। সর্বশেষ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত অ্যাডভোকেট আসাদোজ্জামানের স্মরণ সভায় বিশাল শোডাউন করেন। স্থানীয় রাজনীতিতে বর্তমানে তারা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদরের সাংসদ মো. নজরুল ইসলামের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ভূঞা বলেন, একজন এমপি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় দলীয় পদকে পুঁজি করে সুমন পাপিয়াদের মতো সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজদের নরসিংদীতে পুনরায় আমদানি করছেন। যা খুবই দুঃখজনক। ওই এমপি তাদের দায়িত্ব নিলেও আওয়ামী লীগ কোনো অপরাধীর দায় নেবে না।

পরবর্তীতে পাপিয়ার স্বামী সুমন চৌধুরী বেশির ভাগ সময় থাইল্যান্ডে অবস্থান করলেও গত থার্টিফার্স্ট নাইটে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান করেন। ওই রাতে তার কক্ষেও চার-পাঁচ জন সুন্দরী নারী ছিল বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি