সোমবার ১ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » দুর্যোগ মোকাবেলায় যা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু



দুর্যোগ মোকাবেলায় যা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
28.03.2020

নিউজ ডেস্ক: আমাদের সৌভাগ্য আমরা নেতা হিসেবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পেয়েছিলাম। যাঁর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। পেয়েছি একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি দেশ। তিনি না জন্মালে আমরা আজও পরাধীন, নিপীড়িত-বঞ্চিত থেকে যেতাম। তিনি ছিলেন এমন রাজনীতিবিদ, যাঁর রাজনীতির মূলে ছিলো এদেশের মেহনতি মানুষ। তাদের ভালো-মন্দকে বঙ্গবন্ধু মনে করতেন নিজের ভালো-মন্দ। তাই এদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁকে দিয়েছিলো হৃদয়ের সিংহাসনে ঠাঁই।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেকবার তিনি মোকাবেলা করেছেন দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষের মতো মহামারী। বাঙালির জীবনে সমস্যা দেখামাত্রই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু তখন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলের সদস্য। দুর্ভিক্ষের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে। তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় কিছুই ছিলো না। ইংরেজরা ধান-চাল ও নৌকা বাজেয়াপ্ত করেছিলো।

ওই সময়ে ব্যবসায়ীরা মজুতদারি করেছে। দশ টাকার চাল চল্লিশ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তাই চতুর্দিকে হাহাকার। প্রতিদিন না খেতে পেরে রাস্তায় মারা যাচ্ছে লোকজন। বঙ্গবন্ধু লিখলেন, ‘মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্য কাড়াকাড়ি করছে। ছেলে-মেয়েদের রাস্তায় ফেলে মা কোথায় পালিয়ে গেছে। পেটের দায়ের নিজের ছেলে-মেয়েদের বিক্রি করতে চেষ্টা করছে। কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই।’ (সূত্র : অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১৮)।

বঙ্গবন্ধু এমন অবস্থায় দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্ভিক্ষপীড়িতের সেবায়। অনেকগুলো লঙ্গরখানা খুলে তিনি দিনভর অসহায় মানুষজনের পাশে থাকতেন। অতিরিক্ত শারীরিক চাপের কারণে বঙ্গবন্ধু এ সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন।

১৯৫৩ সালে দেশে দেখা দেয় খাদ্য সমস্যা। বঙ্গবন্ধু তখন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। কয়েকটি জেলায় খাদ্য সমস্যা প্রকট হলে তিনি পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে এ সমস্যা সমাধানের জোর দাবি জানান। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন খাদ্যকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলে দেশ এগোবে না। ওই সময় অনেকে খাদ্য সংকট নিয়ে অপরাজনীতিতে লিপ্ত ছিলো।

বঙ্গবন্ধু বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘খাদ্য সমস্যাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। পূর্ববঙ্গের কতিপয় জেলায় খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার মোকাবেলা করার জন্য সরকারকে অবিলম্বে দুর্দশাগ্রস্থদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ, সহজ শর্তে যথেষ্ট পরিমাণ বীজ ও যথেষ্ট সংখ্যক গরু ঋণদান ও দুর্দশাগ্রস্থ এলাকাসমূহে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।’

পরের বছরও বঙ্গবন্ধু স্থায়ীভাবে খাদ্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য রাখেন। কিন্তু সরকার খাদ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করেনি। ফলে খাদ্যের অভাবে অনেক স্থানে মানুষ মারা যেতে লাগলো। ১৯৫৬ সালের মে মাসে খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল হয়। পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করলে আহত হয় অনেক মানুষ। বঙ্গবন্ধু তখন সরকারের স্পষ্ট সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘দেশের খাদ্য পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। প্রত্যহ অনাহারে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সরকার পক্ষ এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করছেন না। উল্টো সরকার পক্ষ ভুখা মিছিলকে দোষারোপ করে বিবৃতি দিচ্ছে।’

বঙ্গবন্ধু এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান। ওই মাসেই তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদকদের জেলার খাদ্যের চাহিদা ও সমস্যা সম্পর্কে তাঁকে রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীতে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হলে এ কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৬৩ সালে ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম বিধ্বস্ত হলে বঙ্গবন্ধু সেখানে যান। পরে পূর্ব পাকিস্তান রিলিফ কমিটির পক্ষ হতে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ কমিটি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে সহযোগিতা সংগ্রহ করে। বঙ্গবন্ধুও অর্থ সংগ্রহ অভিযানে নেমে বিভিন্ন স্থানে যান।

বন্যা আমাদের দেশের বহু পুরনো সমস্যা। বন্যা প্রতিবছর প্রাণহানি ও সম্পদ ধংস করতো। ১৯৬৪ সালের বন্যা যখন হয় তখন স্বাধীনতা দিবস আসন্ন।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘স্বাভাবিক নিয়মে স্বাধীনতা দিবস আবার আমাদের নিকটে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু বন্যাপীড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখের পানি ও আর্তনাদে ভারাক্রান্ত বাতাস ও পরিবেশে আমরা উৎফুল্ল চিত্তে দিনটিকে স্বাগত জানাতে পারছি না।’

বঙ্গবন্ধু বলেন যে, প্রতিবছর বন্যায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হলেও সরকার কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এ ব্যর্থতা সরকারের। এছাড়া সে বছর বঙ্গবন্ধু বন্যাপ্লাবিত এলাকা সফর করে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে চাপ সৃষ্টি করেন।

১৯৬৫ সালের ১১ মে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয় এবং এ ঝড়ে বঙ্গবন্ধু নিজেও আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক অঞ্চল। বঙ্গবন্ধু দুর্যোগ মোকাবেলায় সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। কারণ, গত ১০ বছরের মধ্যে এ ঝড়টি ছিলো ভয়ানক।

সেবার বঙ্গবন্ধু জানান, ‘ঘূর্ণিঘড়ের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার শতকরা ৮০ ভাগ টিনের গৃহ, প্রায় শতভাগ কাঁচাগৃহ বিধ্বস্ত এবং ৭০ ভাগ গবাদি পশু নিহত হয়েছে। তাণ্ডবলীলায় অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটেছে।’ (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ২৩ মে ১৯৬৫)।

বঙ্গবন্ধু দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং অবস্থা পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত কর ও খাজনা মওকুপের আবেদন জানান। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু নিজেও কাজে লেগে পড়েন। এভাবে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট প্রতিটি দুর্যোগে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাধারণ মানুষের পাশে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে দেখলেন বিধ্বস্ত হয়ে আছে দেশ। হানাদাররা সব শেষ করে দিয়ে গেছে। তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণে তাই বাংলাদেশ পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগী হন। এজন্যে তিনি জনগণ ও বিশ্ববাসীর সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন…আমার রাস্তা নাই, আমার ঘাট নাই, আমার খাবার নাই, আমার জনগণ গৃহহারা, সর্বহারা, আমার মানুষ পথের ভিখারী। তোমরা আমার মানুষকে সাহায্য করো। মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রের কাছে আমি সাহায্য চাই। আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও…দিতে হবে, উপায় নাই, দিতে হবে। আমি-আমরা হার মানবো না। আমরা হার মানতে জানি না।’

জনগণ ও বিশ্বের সহযোগিতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু খুব দ্রুত দেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত হন। রাস্তাঘাট মেরামত করেন এবং খাদ্যের দিকে মনোযোগী হন।

তিনি ১৯৭৩ সালে এক জনসভায় বলেন, ‘গত বৎসর দেশ স্বাধীনতা পাওয়ার পরে প্রায় ৭-৮ কোটি মণ খাবার বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। প্রথমে গ্রামে বিলাতে হয়েছে। ১০০ কোটি টাকার মতো রিলিফ বাংলার মানুষকে দিতে হয়েছে। বকেয়া খাজনা যা ছিলো সুদসহ তা সব মাফ করে দেয়া হয়েছে। লবণ ট্যাক্স মাফ করে দেয়া হয়েছে। গত নির্বাচনের সময় বলেছিলাম, ২৪ বিঘা জমির খাজনা মাফ করে দেয়া হবে। ২৫ বিঘা জমির খাজনা মাফ করে দেয়া হয়েছে।’

যুদ্ধের আগের বছর বাংলাদেশ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়। সদ্যস্বাধীন দেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করে গেছেন নিরলস। ১৯৭৩ সালে রাজবাড়ীর জনসভায় তিনি বলেন, ‘১৯৭০ সালে সাইক্লোন হলো, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ হলো। আর ১৯৭২ সালের ছয় মাস পর্যন্ত পানিই হলো না, মানুষ ফসল উৎপাদন করতে পারে না। এ বৎসর আমাকে বিদেশ থেকে প্রায় সোয়াশ’ কোটি টাকার মতো খাবার কিনতে হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে গেছে, কোথায় যাবো? কোথায় পাবো? কে দেবে? কিভাবে আনবো? জাহাজ লাগবে, ট্রাক লাগবে। রেললাইনের প্রায় ৩০০ ব্রিজ ভাঙা ছিলো, ২৯৮টা মেরামত হয়েছে। রাস্তা ভাঙা ছিলো ৩০০ কিলোমিটার। ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা মেরামত করা হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধুর যথার্থ উদ্যোগের কারণে অল্প সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু দেশদ্রোহী ঘাতকদের কারণে তিনি সোনার বাংলা গঠনের কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর অধরা কাজ সম্পন্ন করছেন তাঁরই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

বর্তমান বিশ্ব এক সংকটপূর্ণ মুহূর্তে রয়েছে করোনা ভাইরাসের কারণে। বাংলাদেশেও এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যেমন সকল দুর্যোগে জনগণের পাশে ছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনাও এ দুর্যোগে আমাদের পাশে আছেন। আসুন, আমরা তাঁর নির্দেশনা মেনে চলি, সরকারকে সহযোগিতা করি এবং সচেতন হই। তাহলে খুব দ্রুত করোনার সংক্রমণ থেকে আমরা রক্ষা পাবো ইনশাল্লাহ।

এর আগেও বঙ্গবন্ধুকন্য শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কোনো দুর্যোগ বাংলাদেশে আঘাত হানলে জনসাধারণের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। অনেকস্থানে নিজে উপস্থিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। দুস্থদের বুকে টেনে নিয়েছেন।

এবার করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় তা প্রতিরোধে বদ্ধ পরিকর জননেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার। গোটা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও আতঙ্ক ছড়ানো এ ভাইরাস মোকাবেলার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে সব ধরনের জমায়েত ও লোকসমাগমও। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গরীব দুঃখীরা যেন খাবারের অভাবে অনাহারে না থাকে সেই জন্য, প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করোনায় আক্রান্তদের সেবার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে গণভবনের মেডিকেল ইউনিট। বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে মেডিকেল কিট, চিকিৎসকদের সুরক্ষা পোশাক। এ ভাইরাস রোধে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রত্যেককে স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতে আহবান জানাচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে সরকারের এ সমস্ত উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

আসুন সকলে ঐক্যবদ্ধ হই। সরকারের সঙ্গে এ ভাইরাস মোকাবেলায় আমরা সবাই সামিল হই। সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেমন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, তেমনি করোনা ভাইরাস মোকাবেলায়ও সহায়তা করবে, ইনশাআল্লাহ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি