রবিবার ৫ জুলাই ২০২০



ফেনীতে স্থবির বিএনপি


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
02.06.2020

নিউজ ডেস্ক: ফেনীতে বিএনপির গ্রুপিং দীর্ঘদিনের। নেতাদের দলাদলিতে রাজনৈতিক তৎপরতা নেই বললেই চলে। এতে দল ও অঙ্গসংগঠনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এদিকে ফেনীতে করোনাভাইরাস তথ্য সংগ্রহ ও চলমান পরিস্থতি পর্যবেক্ষণের জন্য গত ১২ মে সেল গঠন করা হয়। দলটির কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ের ৪২ জনকে সেলের সদস্য করা হয়। কিন্তু সেল গঠনের প্রায় একমাস পেরিয়ে গেলেও পর্যবেক্ষণের ফলাফল জনসমুখে আসেনি।

এদিকে জেলাব্যাপী বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পক্ষে ত্রাণ তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো হয়নি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আসা কিছু উপহার অসহায় নেতা-কর্মীদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার খবর স্থানীয় অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এছাড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে নিজেদের মুখ খোলা রেখেই মাস্ক বিতরণ করে সমলোচনার মুখে পড়ে ফেনী জেলা বিএনপি!

জানা গেছে, ফেনী বিএনপির অনেক সমস্যা রয়েছে। নেতাকর্মীরা মামলায় জর্জরিত। কারো কারো বিরুদ্ধে ৩০টি থেকে ১০০টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। কেউ কাউকে মানে না। যে যার মতো চলছে। কোনো কোনো জেলা নেতা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করছেন বলে সাধারণ নেতাকর্মীদের অভিযোগ। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বিএনপি নেতারা বলেছেন, সরকারের এজেন্টরা এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।

সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের পর সারা দেশে বিএনপির রাজনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফেনী জেলা বিএনপিও বাদ যায়নি। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ি হওয়ায় এ জেলাকে বিএনপির ঘাঁটি বলা হতো একসময়। ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলটির নেতৃত্বে ফাটল ধরে। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আরো বেকায়দায় পড়ে দলটি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই সাঈদ এস্কান্দার জেলা বিএনপির হাল ধরেন। কিন্তু তার সময়ে গ্রুপিংয়ের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করে। অবশ্য সাঈদ এস্কান্দারের গ্রুপটিই বেশি শক্তিশালী ছিল।

ফেনী সদর, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞা, সোনাগাজীসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি কমিটি গঠন করেছিলেন। তবে ফেনীর ত্যাগী নেতারা ছিলেন অবহেলিত। প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ভিপি জয়নালকেও কোণঠাসা করে রাখা হয়। তার গ্রুপের লোকজনকে কোনো কমিটিতে রাখা হয়নি।

সাঈদ এস্কান্দার মারা যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার নির্দেশে দলের হাল ধরার চেষ্টা করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান। কিন্তু তিনি ব্যর্থ বলা যায়। একাধিকবার উদ্যোগ নেয়ার পরও যথাযথ কমিটি গঠন করতে পারেননি তিনি। বর্তমানে ফেনীতে পাঁচটি গ্রুপ সক্রিয়। একটি নিয়ন্ত্রণ করেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রেহানা আক্তার রানু, একটিকে নিয়ন্ত্রণ করেন ভিপি জয়নাল, দাগনভূঞা নিয়ন্ত্রণ করেন শিল্পপতি আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছোট ভাই আকবর হোসেন, পরশুরাম ও ফুলগাজী নিয়ন্ত্রণ করেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তালেব, সোনাগাজী নিয়ন্ত্রণ করেন জয়নাল আবেদীন বাবলু। এই দলাদলির কারণে নাজুক অবস্থায় পড়ে জেলা বিএনপি।

একসময় খালেদা জিয়া নিজেই পুরো জেলার দায়িত্বে ছিলেন। সাবেক সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন ও ভিপি জয়নালের ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন তিনি। মোশারফ মারা যাওয়ার পর ভিপি জয়নাল একা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় বিএনপির চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের এক শীর্ষ নেতার হস্তক্ষেপে জেলা বিএনপির পকেট কমিটি গঠন করা হয় বলে অভিযোগ উঠে। ওই কমিটিই এবারের পৌর নির্বাচনের প্রার্থী ঠিক করে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তালিকা পাঠায়। তারা রাজপথে আন্দোলনতো দূরের কথা। কেন্দ্রঘোষিত নিয়মিত কর্মসূচিও পালনে ব্যর্থ হয়।

এসব ব্যর্থতার অবসান করতে চলতি বছরের ২ অক্টোবর ফেনী জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ৯০-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতা শেখ ফরিদ বাহারকে আহ্বায়ক ও আলাল উদ্দিন আলালকে সদস্য সচিব করে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

পাশাপাশি সংগঠনটির ফেনী সদর উপজেলা ও পৌর শাখারও আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফজলুর রহমান বকুলকে আহ্বায়ক ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমান উদ্দিন কায়সার সাব্বিরকে সদস্য সচিব করে ফেনীর সদর উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়।

অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন বাবুলকে আহ্বায়ক ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মেজবা উদ্দিন ভূঞাকে সদস্য সচিব করে পৌর শাখার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক কমিটিতে সবগুলো গ্রুপের সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতেও খুব বেশি ফল হয়নি।

এদিকে নতুন আহবায়ক কমিটি দিয়ে ফেনীতে করোনাভাইরাস তথ্য সংগ্রহের জন্য পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করে। দলটির কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ের ৪২ জনকে সেলের সদস্য করা হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার বিশেষ এ সেলেরও আহ্বায়ক। বিএনপির পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনের নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেলের অন্য সদস্যরা হলেন- জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল, যুগ্ম-আহবায়ক প্রফেসর এম.এ খালেক, গাজী হাবিব উল্যাহ মানিক, এয়াকুব নবী, আলাউদ্দিন গঠন ও আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী, ছাগলনাইয়া উপজেলা আহবায়ক নুর আহম্মদ মজুমদার, সদস্য সচিব আলমগীর বি.এ, পৌর আহবায়ক ইউসুফ মজুমদার, সদস্য সচিব আবদুল লতিফ, সদর উপজেলা আহবায়ক ফজলুর রহমান বকুল, সদস্য সচিব আমান উদ্দিন কায়সার সাব্বির, পৌর আহবায়ক দেলোয়ার হোসেন বাবুল, সদস্য সচিব মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া, সোনাগাজী উপজেলা সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সেন্টু, পৌর সভাপতি আবুল মোবারক দুলাল, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম দুলাল, দাগনভূঞা উপজেলা সভাপতি আকবর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক ছুট্টু, পৌর সভাপতি সফিকুর রহমান বাবুল, সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইফুর রহমান স্বপন, ফুলগাজী উপজেলা সভাপতি শাহজাহান মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক মাষ্টার নুর নবী, পরশুরাম উপজেলা সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব, পৌর সভাপতি শাহাদাত হোসেন মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক মজুমদার, জেলা কৃষক দল সভাপতি আলমগীর চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, শ্রমিক দল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মীর ইদ্রিস বর্তন, যুবদল সভাপতি জাকির হোসেন জসিম, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খন্দকার, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি সাইদুর রহমান জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক এস এম কায়সার এলিন, ছাত্রদল সভাপতি সালাহ উদ্দিন মামুন, সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ আলম মিলন, মহিলা দল সভাপতি জুলেখা আক্তার ডেইজী, সিনিয়র সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস মিতা, সাধারণ সম্পাদক সেলিনা বাচ্চু।

অন্যদিকে প্রায় ১ মাস পেরিয়ে গেলেও পর্যবেক্ষনের প্রতিবেদনের তথ্য গণমাধ্যমে আসেনি।

সেল সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেল গঠন করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে তুলে ধরতে কাজ করছে সেল সদস্যরা।

অপরদিকে করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে নিজেদের মুখ খোলা রেখেই মাস্ক বিতরণ করে সমলোচনার মুখে পড়েছে ফেনী জেলা বিএনপি!

করোনাভাইরাসের প্রকোপ এড়াতে সব ধরণের জনসমাগম এড়িয়ে চলার রাষ্ট্রীয় ঘোষণা থাকলেও ফেনীতে দলবল নিয়ে মাস্ক বিতরণ করতে গিয়ে বিএনপি নেতারা ঘটিয়ে বসেন আরেক বিপত্তি। দলের নেতাকর্মীদের যারা মাস্ক বিতরণ করছেন তাদের মুখেই ছিল না কোনো মাস্ক। মাস্ক বিতরণ শেষে তাদের অনেক নেতাকর্মী তাদের ফেসবুক আইডিতে ছবি পোস্ট করলে সেখানে কমেন্ট করে দল এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিএনপির এমন কাণ্ডে ফেনীতে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। ১৯ মার্চ সকালে ট্রাংক রোডে প্রেসক্লাব ভবনের সামনে বড় বাজারের বিভিন্ন সড়কে জনসাধারণের মাঝে মাস্ক বিতরণ করে দলটির জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা।

দলের শীর্ষ পর্যায়ে জেলা নেতাদের উপস্থিতিতে এমন কর্মকান্ডের সমালোচনা শুনতে বেশি দূর যেতে হয়নি। নিজেদের দলের মধ্যে থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। সাবেক সাংসদ ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি ও জেলা বিএনপির আহবায়ক শেখ ফরিদ বাহারের নেতৃত্বে কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল, যুগ্ম আহবায়ক এম.এ খালেক, গাজী হাবিবুল্লাহ মানিক, আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারীসহ দলটির অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের কয়েকশ নেতা-কর্মীরা।

ফেনী জেলা বিএনপির আহবায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, মামলা ও নানা অপপ্রচার চালিয়ে বিএনপিকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ফেনীর নেতৃত্ব নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। যারা পদ পাননি মূলত তারা কিছু অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি জয়নাল বলেন, সরকার নানাভাবে বিএনপিকে ধ্বংসের চক্রান্ত করছে। মামলা দিয়ে ও চক্রান্ত করে বিএনপিকে শেষ করা যাবে না, কারণ বিএনপি গণমানুষের দল। একসময় জয়নাল হাজারীও বহু চেষ্টা করেছেন, পারেননি। বর্তমানে যারা চেষ্টা করছেন তারাও পারবেন না।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি