শনিবার ৪ জুলাই ২০২০



ডিজিটাল দক্ষতা: প্রতিরোধ নয় আলিঙ্গন করুন


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
23.06.2020

নিউজ ডেস্ক: করোনা যখন ঘাড়ে চেপে গেল এবং আমরা যখন গৃহবন্দী হয়ে পড়লাম তখন অফিস আদালত ব্যবসাবাণিজ্য সচল রাখার জন্য এই প্রয়োজনীয়তাটি দেখা দেয় যে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারি কিনা এবং ইন্টারনেট আমার কাছে আছে কিনা। গত ১১ বছরে দেশে ইন্টারনেটের প্রসার বিশ্বের যে কোন দেশের অঙ্কে সকল কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। ২০০৮ সালে যেখানে বাংলাদেশ ৮ জিবিপিএস ডাটা ব্যবহার করত আর মাত্র ৮ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল সেটি করোনার মাঝে প্রায় ১৮০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহারে পৌঁছেছে আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটিতে পৌঁছেছে। করোনাকালে আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহার শতকরা ৪০ ভাগ বেড়েছে। অন্যদিকে ভয়েস কল শতকরা ২০ ভাগ কমেছে। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে যে আমাদের জনগণের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। বস্তুত করোনাকালের জীবন ইন্টারনেটনির্ভর জীবন। অফিস চালাতে হলে এখন একটি স্মার্ট ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ কিংবা ডেস্কটপ কম্পিউটার লাগে যাতে ইন্টারনেট যুক্ত থাকতে হয়। স্মার্ট ফোন বা ট্যাবে সিমে মোবাইল ইন্টারনেট এবং কম্পিউটারে ক্যাবল ইন্টারনেট থাকা অতি সাধারণ বিষয়। ডিজিটাল শিক্ষা বা অনলাইন শিক্ষার জন্য একটি চরম প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টারনেট ও ডিভাইস। যদিও সরকারীভাবে টিভিকেন্দ্রিক অনলাইন ক্লাস নেয়া হচ্ছে তথাপি চাহিদাটা আসলে ইন্টারনেট কেন্দ্রিক। অবস্থাটা এমন হয়েছে যে এবার এইএসসি পাস করা ছাত্রছাত্রীদের স্নাতক স্তরে ভর্তি করানোর সময় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলো জেনে নিচ্ছে তার অনলাইন ক্লাস করার যন্ত্রপাতি ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা আছে কিনা। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমিতির পক্ষ থেকে ছাত্র ছাত্রীদের জন্য ইন্টারনেটের বিশেষ প্যাকেজ চালু করার অনুরোধ এসেছে। এমনকি তারা তাদের ক্যাম্পাসে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ চাইছে।

একই সঙ্গে আমরা অনুভব করছি যে ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য আমাদের হাতে পর্যাপ্ত ডিভাইস নেই। ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য কমপক্ষে একটি থ্রিজি স্মার্ট ফোন দরকার। আমাদের দেশে ১০ কোটির মাঝে মাত্র তিন কোটি স্মার্ট ফোন রয়েছে। বাকিদের কেউ কেউ পিসি দিয়ে বা ট্যাব দিয়ে হয়তো ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।

এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয় যে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য খাত ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এই ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহার করার দক্ষতা তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। এর একটি উৎকট প্রকাশ ঘটল যখন বিচার বিভাগকে ডিজিটাল করার প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। দেশের দুটি অঞ্চলের উকিলদের নিয়ে দুটি খবর পুরো দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে।

আমাদের জন্য একটি বড় কামনা ছিল বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজ করা। এ জন্য পুলিশ, আইন বিভাগ, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতকে ডিজিটাল করতে হবে। এবার যখন আমরা দীর্ঘ সময় আদালত চালাতে পারলাম না তখন সরকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আদালত পরিচালনার জন্য অধ্যাদেশ জারি করল। সেই অনুপাতে জরুরী মামলার ডিজিটাল শুনানি চলছে। কিন্তু দুঃখজনক দুটি ঘটনা আমাদের আশার প্রদীপটা ম্লান করে দিয়েছে।

প্রথম ঘটনাটি বাগেরহাটের। একটি পত্রিকা থেকে খবরটি উদ্ধৃত করছি।

‘লজিস্টিক সাপোর্ট ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় ভার্চুয়াল শুনানি অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আইনজীবী সমিতির সদস্যগণ। বুধবার (১৩ মে) দুপুরে বাগেরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির এক জরুরী সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

গত সোমবার থেকে ভার্চুয়াল শুনানি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বুধবার পর্যন্ত এই কার্যক্রম শুরু হয়নি বাগেরহাট জেলা জজ আদালতে। বাগেরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ড এ কে আজাদ ফিরোজ টিপু বলেন, ভিডিও কনফারেন্সের সহায়তায় চালু করা নতুন এই পদ্ধতি সম্পর্কে আইনজীবীরা দক্ষ নন।

তিনি আরও বলেন, আদালতের ভার্চুয়াল শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য কম্পিউটার, ল্যাপটপ, এ্যান্ড্রয়েড ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকা ও ব্যবহার জানা জরুরী। আমাদের সমিতির অধিকাংশ সদস্যের তা নেই। এই পদ্ধতির শুনানিতে অংশ নিতে হলে সদস্যকে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে। সরকারের চালু করা আধুনিক এই পদ্ধতিতে ভার্চুয়াল কোর্টে অংশ নেয়া আমাদের জন্য দুরূহ। তাই সমিতির সদস্যদের নিয়ে সাধারণ সভা করে সর্বসম্মতিক্রমে ভার্চুয়াল শুনানিতে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সঙ্গে করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকল আদালত চালু করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।

বাগেরহাট জেলা জজ আদালতের সরকারী কৌঁসুলি মোহাম্মাদ আলী বলেন, আমরা সরকারী এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে আমাদের আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। আধুনিক এই পদ্ধতি চালুর জন্য সবার আগে আইনজীবী ও আদালতের সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে। তাহলে সরকারের এই প্রক্রিয়া সফল হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।’

আমরা ২০০৯ সাল থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ আন্দোলন করতে গিয়ে কোনকালে ভাবতেই পারি না যে উকিলদের মতো কোন জনগোষ্ঠী ২০২০ সালেও ডিজিটাইজেশনের জন্য মোটেই প্রস্তুত নয়। ১১ বছর পার করার পর যদি আমাদের উচ্চশিক্ষিত মানুষেরা ডিজিটাল প্রযুক্তির কাছে অসহায়ত্ব অনুভব করেন তখন আশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখতে পারি না। আমরা তাদেরকে এভাবে অসহায়ত্বের সঙ্গে আত্মসমর্পণ করতে হবে বলে ভাবতেও পারিনি।

উকিল মহোদয়দের এই সিদ্ধান্তের পর আরও একটি খবর মিডিয়ার আসে। সেটি আরও ভয়ঙ্কর। এই খবরে কেবল যে বিচার ব্যবস্থা ডিজিটাল করার বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হয়েছে সেটিই নয় বরং যারা এই ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থায় অংশ নিয়েছে তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

‘ভার্চুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা করায় ১৭ জন আইনজীবীকে বহিষ্কার করেছে গাইবান্ধা বার। ০২/০৬/২০২০ তারিখে বারের সভাপতি ও সেক্রেটারির স্বাক্ষরিত এক নোটিসে ১৭ জন আইনজীবীর নাম উল্লেখ করে তাদেরকে বার থেকে বহিষ্কার করার আদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সদস্যপদ স্থগিত থাকবে বলে নোটিসে বলা হয়েছে।

উক্ত ১৭ জনের মধ্যে কার্যনির্বাহী পরিষদের দুজন সহ-সভাপতি ও একজন সাহিত্য সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক রয়েছে। বর্জনের নোটিস তাদেরকে সরবরাহ করেনি। বারের বর্তমান কমিটির সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক পীযূষ কান্তি পাল বলেন, ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা।

জেলা বার এর প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি গত ১২/০৫/২০২০ ইং তারিখে কার্যনির্বাহী পরিষদের মিটিং ডেকে সিদ্ধান্ত নেন এবং আমাদের মৌখিকভাবে ভার্চুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা করতে নিষেধ করেন। তৎপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি এর জারিকৃত অধ্যাদেশ এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতির কর্তৃক প্র্যাক্টিস ডিরেকশন অনুযাযী ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেমকে সমর্থন দিয়ে আমরা মামলা পরিচালনা করি।

এতে বারের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১৭/০৫/২০২০ ইং তারিখে জেনারেল মিটিং ডাকেন এবং এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন যারা ভার্চুয়াল কোর্টে শুনানিতে অংশ গ্রহণ করবে তাদের বার থেকে বহিষ্কার করা হবে। পরবর্তীতে ০২/০৬/২০২০ তারিখে এই বহিষ্কার নোটিস জারি করেছেন।

বহিষ্কার আদেশ প্রাপ্ত আইনজীবীগণ আরও বলেন, সম্পূর্ণ অবৈধ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেলা বার। তারা মাননীয় প্রধান বিচারপতির আদেশ অমান্য করেছেন। আমাদের বিরুদ্ধে বারের এহেন আদেশের বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ এবং সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি ও সম্পাদক মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ সর্বশেষ তথ্য অনুসারে এই বিষয়টির মীমাংসা উচ্চ আদালত করে দিয়েছে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে আদালত পরিচালনাকে আইনসঙ্গত ঘোষণা করেছে। বস্তুত এটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা যে অধ্যাদেশ সংসদ অনুমোদিত হয়ে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত হচ্ছে।

তবে আমার নিজের কাছে দুটি খবরই এত হতাশার যে বাংলাদেশের ডিজিটাল যাত্রার যে অসাধারণ স্বপ্নটা আমরা দেখছি সেটিতে হতাশার ছায়া ফেলেছে। আমি আশা করব উকিল মহোদয়গণ যা করেছেন অন্য খাতের মানুষেরা কোনভাবেই তাকে সমর্থন করবেন না বা তাদের পথে পা বাড়াবেন না। তবে আইনজীবীদের যে দুটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখলাম তার মতো দৃষ্টান্ত অন্যান্য খাতেও বিরল নয়। দেশে যখন চার কোটি ছাত্রছাত্রী গৃহবন্দী এবং যখন অন্তত উচ্চ শিক্ষার ধারাবাহিকতায় অনলাইন ক্লাস চালু করা দরকার তখন সেই প্রক্রিয়াটি এখনও সচল হলো না। হতে পারে আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা দুই জেলার উকিলদের অবস্থাতেই রয়ে গেছেন। মাধ্যমিক বা প্রাথমিক স্তর সম্পর্কে আমাদের আশাবাদ ততো প্রবল নয়। এই স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে যা এখনও মোকাবেলা করা হয়ে ওঠেনি। তবে এবার করোনা এসে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে ডিজিটাল রূপান্তর ছাড়া ভিন্ন কোন উপায় নেই। করোনা পরবর্তীকালে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প-কলকারখানা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সরকার কোন ক্ষেত্রেই ডিজিটাইজেশন ছাড়া বিকল্প কিছু থাকবে না।

দুনিয়াতে যখন যন্ত্র চালু হয় তখন হরতাল ভাঙচুর হয়েছে, কম্পিউটার চালু হবার পর হরতাল আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে যারা নেতিবাচক পথে হেঁটেছে তারাই হেরেছে। আমরা তো তিনটি শিল্প বিপ্লব পায়ে মাড়িয়ে এলাম। এখন যদি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে শরিক হতে না পারি তবে এই জাতির সামনে চলা থেমে যাবে। এটি একেবারেই বাস্তবতা যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে মানুষকে ডিজিটাল হতে হবে। করোনা চলাকালে বা তার পরে আমাদের জনগণ এই বিষয়ে সতর্ক থাকবে সেটিই আমাদের কামনা। আসুন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলি। সকলের প্রতি আমাদের অনুরোধ হচ্ছে ডিজিটাল বিচারব্যবস্থাকে প্রতিহত করার মতো যে অপদৃষ্টান্ত আমরা দেখলাম সেটি যেন না থাকে। এখন সময় হয়েছে ডিজিটাইজেশনকে আলিঙ্গন করার, প্রতিরোধ করার নয়। কোন অজুহাত দিয়েই আমরা যেন ডিজিটাল যুগের দক্ষতা অর্জন থেকে বিরত না থাকি। আমরা ধন্য যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্য যে কোন রাষ্ট্রনায়কের আগে ডিজিটাল যুগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশকে ডিজিটাল করার ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচী গ্রহণ করেন ও ১১ বছর ধরে বিরামহীনভাবে ডিজিটাইজেশনের কাজ করছেন।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি