বুধবার ১২ অগাস্ট ২০২০



ক্ষুদ্র হচ্ছে রাজনৈতিক ছোট দলগুলো


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
31.07.2020

নিউজ ডেস্ক: দিন দিন ক্ষুদ্র হচ্ছে রাজনৈতিক ছোট দলগুলো। এরা সাধারণত বড় দলের ছত্রছায়ায় নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য জানান দেয়। ভোট এলে বড় দলগুলোর কাছ থেকে আসনসহ নানা সুযোগ-সুবিধা আদায় করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে তাদের কদর ছিল। কিন্তু ভোট শেষ হয়ে যাওয়ায় একদিকে তাদের কদর কমেছে, অন্যদিকে তারা নিজেরা আত্মকলহে জড়িয়ে পড়েছে।

১৪ দলীয় জোটে থাকা বামপন্থী দল জাসদ-বাসদ কয়েক দফায় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে থাকা গণফোরাম ও জেএসডিও অবশেষে ভেঙে গেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো এখন বিভক্ত। জোটের প্রধান শরিক বিএনপি নানা সংকটে রয়েছে। জামায়াত নেতারা দলীয় পদ-পদবির লড়াইয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। জোটের শরিক এলডিপি, লেবার পার্টি, জাগপা, ইসলামী ঐক্যজোটসহ কয়েকটি ছোট দল এরইমধ্যে কয়েক দফা ভেঙেছে।

গত বছর আদর্শগত বিরোধের জের ধরে তৃতীয় দফায় ভেঙে যায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। গত ২২ অক্টোবর পার্টির মূল নেতৃত্বের বিচ্যুতির কারণ দেখিয়ে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরো সদস্য বিমল বিশ্বাস। এ ঘটনার চারদিন পর ২৬ অক্টোবর পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ২৮ অক্টোবর দশম কংগ্রেস বর্জনের ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় আরো ছয় নেতা।

তারা হলেন, পলিটব্যুরো সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জাকির হোসেন হবি, মোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু, অনিল বিশ্বাস ও তুষার কান্তি দাস।

গত ২৯-৩০ নভেম্বর যশোরে ‘বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মতাদর্শ রক্ষা সমন্বয় কমিটি’র ব্যানারে জাতীয় সম্মেলন করে ১১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) নামে এই দলের সভাপতি নুরুল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইকবাল কবির জাহিদ। সংগঠনের উপদেষ্টা করা হয় বিমল বিশ্বাসকে। গত ২-৩ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয় রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির দশম কংগ্রেস। ওই কংগ্রেসে মেনন সভাপতি ও ফজলে হোসেন বাদশা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। এর আগে আরো দুই দফা ভাঙনের মুখে পড়ে ওয়ার্কার্স পার্টি।

২০১৩ সালের ১৬ মার্চ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ভেঙে যায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। তৎকালীন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়ার মধ্যে নেতৃত্বের লড়াইকে কেন্দ্র করে এই ভাঙন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা নিয়ে দলটির নেতারা দুই ভাগ হয়ে যান। জাসদের সভাপতি হন হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয় শিরিন আখতারকে। আম্বিয়া গ্রুপ প্রেসক্লাবে গিয়ে শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে সভাপতি ও নাজমুল হক প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক করে পৃথক কমিটি ঘোষণা করে। এই কমিটির নির্বাহী সভাপতি হন মঈন উদ্দীন খান বাদল। কিছুদিন আগে মঈন উদ্দীন খান বাদল মারা গেছেন।

১৯৮০ সালে জাসদ ভেঙে বাসদ গঠিত হয়েছিল। পরে দুই ভাগ হয়- বাসদ (খালেকুজ্জামান) ও বাসদ (মাহবুব)। বাসদ (মাহবুব) ভেঙে বাসদ (রেজা) গঠিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে বাসদ (খালেকুজ্জামান) ভেঙে বাসদ (মার্কসবাদী) গঠিত হয়। দলের নিয়ম-শৃঙ্খলা না মানার অভিযোগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটির বৈঠকে ১৬ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী। এ নিয়ে পরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেন নেতারা।

২০১৮ সালে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম আউয়ালকে। লক্ষ্মীপুরে একটি আসনের মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়। এরপর আউয়াল ১৪টি ইসলামী দল নিয়ে গঠন করেন ইসলামিক ডেমোক্রেটিক দল। গত ২০১৯ সালে ১৩টি দল বিলুপ্ত করে গঠন করেন ইসলামিক গণতান্ত্রিক পার্টি।

গণফোরামের কমিটি বিলুপ্ত : জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক গণফোরামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি কোন্দলের কারণে বাতিল করেন ড. কামাল হোসেন। তবে তিনি সভাপতিই থাকেন। অন্যদিকে ড. রেজা কিবরিয়াকেও সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হয়েছে।

এর কয়েক মাস আগে মোস্তফা মহসিন মন্টুকে বাদ দিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করেন ড. কামাল। এ ছাড়া দলের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী ও জগলুল হায়দার আফ্রিকসহ কয়েকজন নেতা দলের ভিতরে একটি গ্রুপ তৈরি করেন। কয়েক ভাগে বিভক্ত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি। এ বিষয়টি নিয়েই দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেন সবার ওপরই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এরই মধ্যে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে ড. কামাল হোসেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ভেঙে দেন।

রবের জেএসডিতে ভাঙন : এবার ভাঙনের কবলে পড়েছে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। দলের কাউন্সিল প্রত্যাখ্যান করে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি কনভেনশন ডাকেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। নতুন নেতৃত্বে এখন চলছেন আবদুল মালেক রতনরা। এর আগে ২০০১ সালে জাসদ থেকে বেরিয়ে এসে জেএসডি গঠন করেন আ স ম আবদুর রব। এ প্রসঙ্গে আবদুল মালেক রতন দাবি করেন, তার সঙ্গে দলের সিনিয়র সহসভাপতি এম এ গোফরান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউল করীম ফারুক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক, সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিয়া খোন্দকার, শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও সারা দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বড় অংশই রয়েছেন।

২০ দলে ভাঙাগড়া : ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেই জোট থেকে প্রথমেই বেরিয়ে যান এরশাদ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশীদার হয় জাতীয় পার্টি। এরপর ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৮-দলীয় জোট। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল যোগ দিলে তা পরিণত হয় ২০-দলীয় জোটে।

বিএনপির এই জোটে প্রথম ভাঙন লাগে ২০১৫ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জোট থেকে বেরিয়ে যায় শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। প্রয়াত নিলুর অভিযোগ ছিল ২০ দলীয় জোটে বিএনপি-জামায়াত সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিত। এর পরের বছরই ফের ভাঙনের মুখে পড়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের জোটের সম্পর্ক ত্যাগ করে ইসলামী ঐক্যজোট। সরাসরি কাউকে দায়ী না করলেও নিজ সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানিয়েছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী। এরপর ভাঙন লাগে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (এনডিপি)। এ ছাড়াও খণ্ডবিখণ্ড হয় লেবার পার্টি ও জাগপা। সেক্ষেত্রে সবগুলো দলের একটি অংশ থেকে যায় ২০ দলে।

দুই ভাগে এলডিপি : জাতীয় মুক্তিমঞ্চ ইস্যুতে মতবিরোধকে কেন্দ্র করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ভেঙেছে। এলডিপির শীর্ষনেতার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গত বছরের ২৬ জুন পদত্যাগ করেন জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ আবদুল করিম আব্বাসী, সাবেক এমপি আবদুল্লাহ ও সাবেক এমপি আবদুল গণি ছাড়াও দলটির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম। তাদের নেতৃত্বে এলডিপির একাংশ চলছে। তাদের দাবি, তারাই এলডিপির মূল শক্তি।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি