রবিবার ২৫ অক্টোবর ২০২০



জিয়াউর রহমান : এক ক্ষমতালোভী স্বৈরশাসকের গল্প


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
15.10.2020

নিউজ ডেস্ক : স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোর অমাবশ্যায় ডুবে যায় ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টের পর থেকে। যার স্থায়ীত্ব ছিলো ১৯৮১ সাল পর্যন্ত। এ সময় নিজেকে শাসক ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন স্বৈরশাসক জিয়া।

জিয়ার শাসনামলকে কেবল বাঙালির ইতিহাসের লজ্জা ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবেই অভিহিত করা যায়। কারণ জিয়াউর রহমান হচ্ছেন সেই ব্যাক্তি যিনি জামায়াতে ইসলামীসহ যারা ১৯৭১সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল,তাদের পুনর্বাসন করেছিলেন।

১ মে ১৯৭৬ ঢাকায় এক শ্রমিক সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সে সময় মানুষকে অবাধে ধর্ম পালন করতে দেয়া হয়নি। তার ঠিক দু’দিন পর ৩ মে ১৯৭৬ সরকার এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জেনারেল জিয়া সংবিধানের ৯ সংশোধনীর মাধ্যমে তা আইনে পরিণত করেন। এর ফলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ অপরাপর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহ আবার তাদের তৎপরতা শুরু করে। রাষ্ট্র-সমাজ আর রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত রাজাকার, আলবদর, আল শামস্ বাহিনীর সদস্যরা।

ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতা বিরোধীদের সুযোগ দিয়েছে তা নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষ্ঠুরভাবে দমনও করেছেন। সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তার সময়। যার কারণে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। সেই ক্ষোভের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত অপমৃত্যু ঘটে জিয়ার।

পঁচাত্তরপরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার মধ্যকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণকারী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অভিলাষ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। সামরিক সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলসমূহ যখন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল- ঠিক সেই সময়ে ২১ নবেম্বর ১৯৭৬ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এএসএম সায়েম এক ঘোষণার মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে প্রতিশ্রুত সাধারণ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। সরকারী আদেশের প্রতিবাদ করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, রাজবন্দীদের মুক্তি এবং অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দাবি করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নবেম্বর সেনাপ্রধান ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদ গ্রহণ করেন এবং তার চাপের কারণেই ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম পদত্যাগে বাধ্য হন এবং জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৬ লন্ডনের বিখ্যাত ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় বলা হয়, ‘প্রশাসন ক্ষেত্রে সায়েমের (প্রেসিডেন্ট) কোন ভূমিকা ছিল না এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে পরামর্শও করা হতো না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিনি পীড়াপীড়ি করছিলেন এবং শাসনক্ষমতা থেকে সামরিক বাহিনীকে বিদায় দেয়ার জন্য তিনি ঘরোয়াভাবে শলা-পরামর্শ শুরু“করেছিলেন। এখন তাঁকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে। সায়েমকে অসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতদিন রাখা হয়েছিল (মে.জে.) জিয়ার সামরিক শাসনের চেহারা ঢেকে রাখার জন্য।’

জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করে সেদিনই গ্রেফতার করেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাজেদা চৌধুরী, আবদুল মোমেন তালুকদার, সালাউদ্দিন ইউসুফ, মোজাফফর হোসেন পল্টু, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া এবং ন্যাপ নেতা মতিয়া চৌধুরীসহ আরও অনেককে।

স্বাধীনতা সংগ্রামেও জিয়ার অদক্ষতা ও পাকিস্তানের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তিরও অভিযোগ রয়েছে। মোট কথায় জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ স্বরূপ। দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করা, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ ও স্বাধীনতা স্বপক্ষের শক্তিদের নিশ্চিহ্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন জিয়া। দেশের রাজনীতিতে বিভাজন, বিশৃঙ্খলা ও হানাহানি সৃষ্টি হয়েছিল জিয়ার শাসনামলেই। বিএনপিকে রাজনৈতিক ক্লাবে পরিণত করেছিলেন জিয়া। সর্বসাধারণের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করে তুলেছিলেন তিনি। শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশিদের জন্য কালের অভিশাপ হয়ে এসেছিলেন জিয়া।

ইতিহাসবিদদের মতে, একজন সামরিক অফিসারের বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখল, নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা, অবৈধ উপায়ে একই সাথে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি থাকা, হ্যাঁ-না ভোট, সামরিক শাসন নিয়ন্ত্রিত ঘরোয়া রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনীতি, উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবৃক্ষ রোপণ, মদ, জুয়া ও পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ইচ্ছামতো ফরমান আদেশ অধ্যাদেশ জারির মতো যাবতীয় কুকর্মের সাক্ষী জিয়ার শাসনামল। রাজনীতির কালসাপ ছিলেন জিয়া। সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন ক্ষমতালোভী জিয়া। তাই জিয়ার কুকর্মের দায়ভার নিয়ে সারাজীবন বিএনপিকে হিনমন্নতায় ভুগতে হবে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি