শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » নুর, রাশেদ, ফারুকদের দুর্নীতির ফিরিস্তি ফাঁস!



নুর, রাশেদ, ফারুকদের দুর্নীতির ফিরিস্তি ফাঁস!


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
18.10.2020

নিউজ ডেস্ক: নারী ধর্ষণ, ত্রাণের টাকা লোপাটকে কেন্দ্র করে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অধিকাংশ নেতার বিদ্রোহের মধ্যেই এবার ফাঁস হলো ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরসহ তার সহযোগী শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতি অনিয়মের ফিরিস্তি। কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের বহু নেতার বিদ্রোহে নুর, রাশেদ, ফারুককে অবাঞ্ছিত করে নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্যেই ফাঁস হয়েছে তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে সংগঠনের ২১টি ইউনিটের লেখা সম্মিলিত হুঁশিয়ারি। যেখানে আট দফা দাবি নিয়ে ২১ ইউনিটের নেতারা তুলে ধরেছেন নুর, রাশেদ, ফারুকসহ শীর্ষ কয়েক নেতার স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতির ফিরিস্তি।

নিজেদের ‘সৎ চরিত্রবান’ দাবি করে উগ্রবাদী চেহারা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে ফেলে দেয়ার হুঙ্কার দিলেও আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছিলো কথিত কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের শীর্ষ নেতাদের আসল চেহারা। গত কিছুদিন ধরেই সংগঠনে অনেকটা এক ঘরে হয়ে পড়েছেন নুরসহ সহকর্মীর দায়ের করা ধর্ষণ মামলার সকল আসামি। একই সঙ্গে তাদের পাশে থাকা নেতা রাশেদ খান। এমন অবস্থার মধ্যেই বৃহস্পতিবার সহকর্মী নারীদের ধর্ষণ, নারী লাঞ্ছনা, ত্রাণের টাকা লুটপাট, ফাঁয়দা লেটার রাজনীতি, আর শীর্ষ কয়েক নেতার স্বেচ্ছাচারিতায় ভেঙ্গে যায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কোটা সংস্কার ও সড়ক আন্দোলননে আলোচিত এ সংগঠন থেকে অপকর্মের জন্য শীর্ষ তিন নেতা নুরুল হক নুর, রাশেদ খান, ফারুক হোসেনকে অবাঞ্চিত করে ২২ সদস্যের নতুন আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এই ঘটনায় নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টির মধ্যেই শনিবার সংগঠনের নেতাদের মাধ্যমেই ফাঁস হয়েছে ২১ টি ইউনিটের বিদ্রোহসহ নানা ঘটনা। সংগঠনের নিজস্ব প্যাডে ২১ ইউনিটের দেয়া অভিযোগ ও দাবির তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ও নতুন ঘোষিত বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহবায়ক এপিএম সুহেল বলেছেন, যুব কমিটি স্থগিত করে পুনরায় সদস্য সচিব পদে ভোট গ্রহণ এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ, স্থায়ী কমিটি গঠন, গঠনতন্ত্র তৈরি, হিংস্র-উশৃংখল নেতাদের বহিষ্কার, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভোটাধিকার, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১০ দফা দাবিতে ছাত্র অধিকার পরিষদের ২১ টি ইউনিটের দায়িত্বশীল নেতারা আহ্বায়ক বরাবর চিঠি দেয়।

৪৮ ঘন্টার মধ্যে দাবি না মানলে সকল ধরণের কার্যক্রম স্থগিত করা হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য, প্রয়োজনে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে ‘বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ’ এর বিরুদ্ধাচারণ করা ও ঢাবি কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট করার সঙ্গে জড়িত সকলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার আল্টিমেটাম দেন তারা।

বিদ্রোহ প্রশমন করতে মিটিং হয়। সেখানে বিদ্রোহকারীদের সঙ্গে নুরের বাকবিতন্ডা হয়। পরবর্তীতে বিদ্রোহে নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহবায়ক এবং বিভাগীয় কমিটিগুলোতে পদ দিয়ে কোনমতে সংগঠনে শৃঙ্খলা আনা হয়। নুর কাউকে আর্থিক হিসাব দিত না। সে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা আনত। জিজ্ঞাসা করলে, সে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি এড়ানোর অজুহাতে বিষয়গুলো গোপন রাখত।

এদিকে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, ২১টি ইউনিটের দায়িত্বশীল নেতারা স্বাক্ষর করে অভিযোগের তথ্য তুলে ধরেছেন। বলা হয়, ‘এক মাস আগেও মানুষের আবেগ ও বিশ্বাস নিয়ে নোংরা রাজনীতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা, স্বেছাচারিতা, অগণতান্ত্রিকভাবে সংগঠন পরিচালনা, ত্যাগী ও দুঃসময়ের সহযোদ্ধাদের মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অবমূল্যায়ন করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে সংগঠনের ২১টি ইউনিটের একযোগে লিখিত হুঁশিয়ারি।’

প্রথম দাবি তুলে ধরে বলা হয়, ‘যুব কমিটি স্থগিত করে পুনরায় সদস্য সচিব পদে ভোট গ্রহণ এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে।’ এরপর বলা হয় ‘একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে যেখানে ৫০% থাকবে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ও বাকি ৫০% থাকবে শাখা কমিটিগুলো থেকে। এই স্থায়ী কমিটি ছাত্র, যুব, প্রবাসী থেকে শুরু করে সকল অঙ্গ সংগঠন পরিচালনা করবে। যাতে সংগঠন এর শুরু থেকে কাজ করে আসা ত্যাগীরা পুরনো হয়ে গেলেও মূল্যায়ন পায় এবং সংগঠন এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ঠিক থাকে, স্বতন্ত্রতা বজায় থাকে। অন্য কোন দল থেকে কেউ এসে যাতে সংগঠন ভিন্ন খাতে পরিচালনা করতে না পারে। ছাত্র, যুব এবং প্রবাসীসহ সকল অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিও এই স্থায়ী কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।’

তিন নম্বরে বলা হয় ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গঠনতন্ত্র তৈরি করে তা প্রকাশ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সংগঠন পরিচালনা করতে হবে। গঠনতন্ত্র প্রকাশের জন্যে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’ এরপর বলা ‘সোহরাব হোসেন ও নাজমুল হুদা সাত কলেজের নেতাদের মারতে আসা, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেয়ার কঠোর শাস্তি দিতে হবে। এবং সোহরাবের মত হিংস্র গুন্ডা স্টাইলের নেতাকে কোনভাবেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা যাবে না, প্রয়োজনে এই বিষয়ে ত্যাগীদের ভোট নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

পাঁচ নম্বর দাবি হচ্ছে ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভোটাধিকার থাকতে হবে। শাখা গ্রুপে কেন্দ্রীয় নেতারা আধিপত্য দেখাতে পারবে না, তবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রের নিকট জবাবদিহি করবে। ভবিষ্যত নির্বাচনে তৃণমূলকে মূল্যায়ন করতে হবে। জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া যাবে না।’

বলা হয়, তৃণমূল পর্যায়ে যুব অধিকার পরিষদের প্রায় সকল কাজ ছাত্র অধিকার পরিষদ করছে। তাদের ছাত্রত্ব শেষে তাদের ত্যাগ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ সাত নম্বর দাবি হচ্ছে, ‘সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে ব্যক্তি অনুযায়ী আইন পরিবর্তন না করে সবার জন্য একই আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। ফেসবুকে সংগঠনকে নিয়ে কটূক্তি, পদত্যাগপত্র পোস্ট করলে কাউকে দ্রুত সংগঠনে ফেরানো যাবে না। ফেরাতে হলেও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ সবশেষ দাবি হচ্ছে, ‘আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’ এসব দাবি তুলে আল্টিমেটাম দিয়ে বলা হয়েছে, ‘দাবি না মানলে সকল ধরণের কার্যক্রম স্থগিত করা হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য, প্রয়োজনে বাটপারি, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে ‘বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ’ এর বিরুদ্ধাচারণ করা ও ঢাবি কেন্দ্রীয় সিন্ডিকেট করার সঙ্গে জড়িত সকলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে।’

‘গণচাঁদা চাইলেন নুর-রাশেদরা!

এদিকে অর্থ লোপাটসহ নানা কেলেঙ্কারীর মধ্যেই নুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, যুব অধিকার পরিষদ, শ্রমিক অধিকার পরিষদ নামে সংগঠনটি পরিচালনা করতে অর্থ সহায়তা চেয়ে ফেসবুকে আহ্বান জানিয়েছেন রাশেদ খান। রাশেদ খান এক ফেসবুক লাইভে এসে বলেছেন, ‘সংগঠন চালাতে আমাদের এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। নানান কারণে অর্থের সহায়তা প্রয়োজন। আপনাদের সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আরও বেশি সুসংগঠিত করার জন্য আমরা গণচাঁদা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি। এই সংগ্রামে আপনার আর্থিক সহযোগিতা কামনা করছি।’ এভাবে চাঁদা আদায়ের খবর প্রকাশের পর শুরু হয়েছে ব্যপক সমালোচনা। সংগঠনের নেতারাই বলছেন, ‘এটা হচ্ছে অভিযুক্ত নেতাদের বাঁচাতে নতুন কৌশল। এর মাধ্যমে সাধারণ সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন অভিযুক্তরা যে তাদের কাছে কোন টাকা নেই। তারা কোন অর্থ লোপাট করেননি। এটা হচ্ছে আরেক নাটক।’



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি