মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারী ২০২১



মূর্তি ও ভাস্কর্য এক নয়


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
24.11.2020

নিউজ ডেস্ক: মূর্তি ও ভাস্কর্য, স্থাপত্যকলার দুটি ভিন্ন বিষয়। এই দুটির মাঝে রয়েছে বিস্তর তফাৎ। ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে পৃথিবী বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভাস্কর্য নির্মাণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। অনেক মুসলিম দেশেও তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়কদের ভাস্কর্য নির্মাণ করে সম্মান প্রদর্শন করেছে। ঠিক তেমনিভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সম্মানার্থে ভাস্কর্য নির্মাণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে ভাস্কর্যকে মূর্তির সাথে তুলনা করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তারা মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য না বুঝেই নানা গুজব ছড়াচ্ছে।

মূর্তি এবং ভাস্কর্য কখনোই এক হতে পারে না। যার ব্যাখ্যা সহজেই তুলে ধরা যায়। মূর্তি শব্দের অর্থ আক্ষরিক অর্থ হল “অবয়ব”। সাধারণত পাথর, কাঠ, ধাতু অথবা মাটি দিয়ে মূর্তি নির্মাণ করা হয়। মূলত হিন্দু ধর্মীয় সংস্কার বা শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দেবতার মূর্তি নির্মিত হয়ে থাকে। দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার জন্য মূর্তি নির্মাণ করা হয়ে থাকে।

আর ভাস্কর্য যা ইংরেজি ভাষায় (Sculpture) ত্রি-মাত্রিক শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলে। সব মূর্তিই যেমন ভাস্কর্য নয়, তেমনি ভাস্কর্যকে মূর্তি বলা চলে না। অর্থাৎ ভাস্কর্য আর মূর্তি এক জিনিস নয়। তাহলে ভাস্কর্য কি? খুব সহজ করে যদি বলতে হয়, ভাস্কর্য হলো শিল্প। মূর্তি ও ভাস্কর্য কখনোই এক নয় বা তাদের ধরণ এক নয়। প্রথমত, তাদের ছোট করে সংজ্ঞাতেই যার স্পষ্টতা পাওয়া যায়। আরো যদি বিস্তারিত বলা হয় তাহলে মূর্তি বা প্রতিমা হলো- প্রতিমাকে পূজা করা হয়, তার কাছে প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া প্রতিমাকে ভাগ্যবিধাতা, রিজিকদাতা, শক্তিদাতা, এমনকি হুকুমদাতার আসনেও বসানো হয়। অন্যদিকে ভাস্কর্য একটি প্রাচীনতম শিল্পকলা। একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পকলা, রুচিবোধের নিদর্শন হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। এই ভাস্কর্য শিল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার বছর পূর্বের বিভিন্ন সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া আজ সহজ হচ্ছে।

আমরা মূর্তি বলতে সাধারণভাবে এমন এক প্রতিরূপ বুঝি যা পূজা করার জন্য স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু ভাস্কর্য বলতে বুঝি এমন একটি প্রতিকৃতি যা পূজার জন্য স্থাপিত হয়নি। প্রায়োগিক দিক বিবেচনা করলে বলতে হয়, যে সকল প্রতিকৃতি পূজ্য নয়, তা-ই ভাস্কর্য৷ মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে আর একটি ছোট পার্থক্য দেখা যায়। ভাস্কর্যের মধ্যে ভাস্করের স্বকীয় সৃজনশীল চেতনার চিহ্ন যতটা পরিস্ফুট হয়, পূজার লক্ষ্যে নির্মিত প্রতিকৃতিসমূহের মধ্যে ততটা হয় না। পূজার জন্য নির্মিত প্রতিকৃতিতে ব্যক্তির আসন-বসন ও বাহ্যিক রূপকে সবক্ষেত্রে প্রায় অভিন্ন রাখা হয়। কিন্তু ভাস্কর্যে, ভাস্কর নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে তাকে নিজের অনুভবগত চেতনায় সৃষ্টি করে।প্রায়োগিক ব্যাখ্যায় আমেরিকার বিখ্যাত স্ট্যাচু অফ লিবার্টি মূর্তি নয় ভাস্কর্য। কারণ এটি পূজিত হয় না। পূজিত হলে আমাদের প্রায়োগিক ও মনোগত ব্যাখ্যায় এটিও মূর্তি হয়ে যেত। পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশের জনবহুল স্থানে রয়েছে অনেক ভাস্কর্য। উদাহরণসরূপ যদি আমরা আমাদের দেশের সুপ্রিমকোর্টের ভাস্কর্যটির কথাই বলি তাহলে, সুপ্রিমকোর্টের ভাস্কর্যটি রোমানদের কাছে ন্যায় এর প্রতীক। রোমান আইন থেকেই যেহেতু আমাদের বিচার ব্যবস্থার উৎপত্তি, তাই অন্যান্য দেশের মতো এখানে এ ভাস্কর্য থাকাটা অপ্রাসঙ্গিক নয়। এ উপমহাদেশের অধিকাংশ খ্যাতনামা স্থাপত্যই মুসলমান শাসকদের সৃষ্টি।

পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশেই মুসলমান মনীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়কদের ভাস্কর্য রয়েছে। সৌদি আরবে দেখা যায় উট, ঘোড়া বা গাংচিলের ভাস্কর্য। রাজধানী জেদ্দার উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে নগরীতে মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, মানব চোখ, মরুর বুকে উটের ভাস্কর্য। ইরাকের রাজধানী বাগদাদজুড়ে রয়েছে বেশকিছু বিখ্যাত মূর্তি রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল জোনে হাম্মুরাবির মূর্তি। বাগদাদ শহরের আবু নুয়াস স্ট্রিটে শাহেরজাদি পার্কে রয়েছে আরব্য উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শাহেরজাদি এবং রাজা শাহরিয়ারের মূর্তি। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কেন্দ্রস্থল সিটিডাল অব দামেস্কে বীর মুসলিম সেনাপতি সালাদিন এর স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে ‘স্ট্যাচু অব সালাদিন’। ইরানের রাজধানী তেহরানের ফেরদৌসি স্কয়ারে স্থাপিত মহাকবি ফেরদৌসির ভাস্কর্য, ইরানের হামাদানে ইবনে সিনার ভাস্কর্য, তেহরানের লালেহ পার্কে ওমর খৈয়ামের ভাস্কর্য, কবি হাফিজের ভাস্কর্য, খোরাসানের মাসাদে নাদির শাহর ভাস্কর্য। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির একাধিক ভাস্কর্য ও ম্যুরাল রয়েছে ইরানে। পাকিস্তানের স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনের সামনে ষণ্ডভাস্কর্য। তুরস্কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্কের অগণিত ভাস্কর্য। কাতারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো ‘হারনেসিং দ্য ওয়ার্ল্ড’, মানে হচ্ছে বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ। কাতারের রাজধানী দোহায় কাতার সংস্কৃতি কেন্দ্রে কাতারা আম্পি থিয়েটারের সামনে স্থাপিত হয় পুরো পৃথিবীকে সংযোগ স্থাপন করা নারী প্রতিমূর্তির অবয়বের এই ভাস্কর্য।

তাই বলা যায় মূর্তি ও ভাস্কর্য কখনই এক নয়, তাদের মাঝে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্যগুলোই মূর্তি ও ভাস্কর্য যে এক নয় তার দলিল। কিন্তু মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য বুঝতে না পেরে কিছু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে। তারা ভাস্কর্যকে মূর্তি বলে মিথ্যাচার করছে। শিল্প-সংস্কৃতির সঠিক জ্ঞানের অভাবেই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রটি ভাস্কর্য নিয়ে অপব্যাখ্যা দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞজনরা। তাই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের গুজব এড়িয়ে চলতে দেশবাসীকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

 



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি