মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারী ২০২১



বরিশালে ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ঘুষ কেলেঙ্কারি


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
25.11.2020

ডেস্ক রিপোর্ট: দেড় যুগেরও বেশি সময় পর উপজেলাগুলোতে কমিটি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বরিশালের ছাত্রদল নেতারা। প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কমিটি না করায় তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

জেলার ১০ উপজেলায় কমিটি গঠন প্রশ্নে ঘুষ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে নানা নগ্ন হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে কয়েকজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। একদিকে তারা তাদের নিজস্ব লোকজন দিয়ে করতে চাইছেন কমিটি আর কথা না শুনলেই দিচ্ছেন হুমকি।

পুরো বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জেলা ছাত্রদল সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠু বলেন, পরিস্থিতি এমন যে, ছাত্রদলের কমিটি গঠন কঠিন হয়ে পড়েছে। উনারা যেভাবে বলবেন সেভাবেই যেন করতে হবে সব।

প্রায় ১৮ বছর ধরে কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছিল না বরিশাল জেলা ছাত্রদলের। অধিকাংশ উপজেলাগুলোতেও একই পরিস্থিতি। বছরের পর বছর পদ-পদবি না পাওয়া আর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চালাতে গিয়ে সাংগঠনিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ে ছাত্রদল।

২০১৮ সালের শেষের দিকে মাহফুজুল আলম মিঠুকে সভাপতি এবং কামরুল আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি। পদ-পদবিসহ পাঁচজনের নাম ঘোষণার পাশাপাশি তাদেরকে বলা হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে। এ প্রক্রিয়া চলার মধ্যে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা আসে সকল উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার। সেই কমিটি করতে গিয়েই এখন বিপাকে পড়েছে ছাত্রদল।

সপ্তাহখানেক আগে জেলা ছাত্রদল সভাপতি মিঠুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে পদ পাইয়ে দেয়ার নাম করে ঘুষ বাণিজ্যের। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে কমিটি গঠন নিয়ে প্রভাবশালী নেতাদের চাপের মুখে থাকা ছাত্রদল নেতাদের অসহায়ত্ব আর জিম্মিদশার কাহিনী। প্রায় প্রতিটি উপজেলা থেকেই বিবদমান প্রভাবশালী নেতাদের ৩/৪টি করে কমিটির প্রেসক্রিপশন এবং মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ চেষ্টার পাশাপাশি কথা না শুনলে নানা হুমকি দেয়ার বিষয়ও বেরিয়ে আসে সামনে।

কমিটি প্রশ্নে ঘুষ কেলেঙ্কারির যে বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত তা হল- পছন্দসই কমিটি পেতে হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ আসনের সাবেক এমপি বিএনপি নেতা মেসবাহউদ্দিন আহম্মেদ কর্তৃক জেলা ছাত্রদল সভাপতি মিঠুকে ৫০ হাজার টাকা দেয়ার বিষয়টি।

মিঠু বলেন, ওই দুই উপজেলায় তার (মেসবাহ) পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি করার জন্য ৫০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। বিষয়টি কেন্দ্রে জানানো হলে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই ৫০ হাজার টাকা কেন্দ্রে জমা দেয়া হয়। এরপর থেকেই সাবেক এমপি মেসবাহসহ তার ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী নেতারা আমার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেসবাহউদ্দিন বলেন, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ আসনে নির্বাচন করতে চান। আমাকে বেকায়দায় ফেলতে পারলে ভবিষ্যৎ মসৃণ হবে ভেবে জেলা ছাত্রদল নেতাদের দিয়ে তিনি এ ষড়যন্ত্র সাজিয়েছেন। বরিশালের সবাই জানে ছাত্রদলের সভাপতি-সম্পাদক পদে যারা আছেন তারা রাজীবের লোক। এখানে খেলাটা খেলছেন রাজীব। এসবই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।

হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জের মতোই জটিলতা জেলার অপর আট উপজেলার কমিটি গঠন নিয়ে। ছাত্রদল নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বরিশাল-১ নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলা গৌরনদী-আগৈলঝাড়া থেকে তিনটি করে কমিটি দেয়া হয়েছে জেলা ছাত্রদলের কাছে। এর দুটিতে সুপারিশ করেছেন দুই উপজেলার বিএনপি নেতারা।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এখানে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভাজন রয়েছে প্রভাবশালী তিন বিএনপি নেতা আকন কুদ্দুসুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান এবং সাবেক এমপি জহিরুদ্দিন স্বপনের মধ্যে। স্থানীয় নেতারা যে দুটি কমিটিতে সুপারিশ করেছেন তার একটি কুদ্দুস এবং অপরটি সোবাহানের। স্বপন সরাসরি স্বীকার না করলেও তৃতীয় কমিটির প্রস্তাবনা এসেছে মূলত তারই ইশারায়।

বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলার জন্য সোবাহানের মোবাইলে ফোন দেয়া হলে তিনি তা ধরেননি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, কমিটি গঠন প্রশ্নে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশনা রয়েছে। এখানে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। দুই উপজেলার নেতারা যে সুপারিশ করেছেন আমি তাদের সঙ্গে একমত।

বরিশাল-২ নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলা উজিরপুর ও বানাড়ীপাড়ায় কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া সরফুদ্দিন সান্টু, উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আ. মান্নান মাস্টার এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুর রহমান জুয়েল। এরা প্রত্যেকেই চাইছেন নিজেদের পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি করতে। এজন্য পাল্টাপাল্টি একাধিক কমিটি জমাও দেয়া হয়েছে জেলা ছাত্রদলের কাছে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, ভবিষ্যতে এ আসনে নির্বাচন করতে চান জুয়েল। যে কারণে এখন থেকেই মাঠ গোছাতে চাইছেন তিনি। অপরদিকে একই আশায় দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন সান্টু ও মান্নান মাস্টার। মাঝখান থেকে শ্যাম রাখি না কূল রাখি দশায় পড়েছি আমরা।

এ বিষয়ে অবশ্য কথা বলতে রাজি হননি স্থানীয় নেতাদের কেউ।

হতাশার সুরে জেলা ছাত্রদলের একাধিক নেতা বলেন, বাকেরগঞ্জের সাবেক এমপি উপজেলা সভাপতি আবুল হোসেন খান ২১ জনের একটি কমিটি জমা দিয়েছেন। সেখানে সভাপতি-সম্পাদক পদে যাদের সুপারিশ করা হয়েছে তারা দুজনেই বিবাহিত। অথচ কেন্দ্রের সুস্পষ্ট নির্দেশনা বিবাহিত কাউকে কমিটিতে রাখা যাবে না।

বরিশাল সদর উপজেলায় বিএনপি নেতাদের বিভাজন বহু পুরনো। এখানে তালিকাও এসেছে দুটি। এর মধ্যে একটি তালিকায় সভাপতি-সম্পাদক পদে যাদের নাম দেয়া হয়েছে তারা মাদক মামলার আসামি। এদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কেন্দ্রে তালিকা না পাঠালে নানা মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হয় আমাদের নামে।

এর আগে কমিটি গঠন প্রশ্নে কেন্দ্রের যারা বরিশাল বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন তাদেরও একইভাবে অবান্তর নানা অভিযোগ দিয়ে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কথা না শুনলেই যদি এমনটা হয় তাহলে কী করে কমিটি করব আমরা।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক এমপি বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন খান বলেন, ২১ সদস্যের একটি প্রস্তাবনা আমি দিয়েছি। তবে তাদের কেউ বিবাহিত ছিল না। তাছাড়া যে কাউকে দিয়ে কমিটি গঠন করলেই তো হবে না। দল চালানোর যোগ্যতাও থাকতে হবে।

বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন বলেন, কমিটি গঠন প্রশ্নে কোনো চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। এমনটা যদি কেউ বলে থাকেন তাহলে তা সত্য নয়।

পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আলাপকালে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান বলেন, কমিটি গঠন প্রশ্নে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল কেন্দ্র থেকে। কিন্তু এখন যা দেখছি তাতে আমরা নয়, আমাদের কমিটি করতে চাইছে কতিপয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা। তাহলে আমাদের আর দরকার কী। এটা দুঃখজনক। বিষয়টি কেন্দ্রকে জানিয়েছি। এখন তারা যা ভালো মনে করবেন তাই করবেন।

 



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি