বৃহস্পতিবার ১৫ এপ্রিল ২০২১



সুরের শহরে পোড়া গন্ধ, কিসের আলামত!


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
30.03.2021

নিউজ ডেস্ক: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এরপর ঢাকা, চট্টগ্রামে মুসুল্লিদের ওপর হামলার গুজব ছড়িয়ে ২৬,২৭,২৮ মার্চ টানা তিনদিন ধরে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। জানা গেছে, সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে মিলে বিএনপি-জামায়াত চক্র এসব হামলা চালায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, সাম্প্রদায়িক শক্তির তাণ্ডবের পর শহরজুড়ে শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন, বাতাসে ভেসে আসছে পোড়া গন্ধ।

সূত্র জানায়, সরকার পতনে একের পর এক আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে, জনসমর্থন হারিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি হেফাজতকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পলাতক আসামি তারেক রহমান নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ব্যবহার করে দেশে অরাজকতা তৈরি করতে দলের নেতাদের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মাদ্রাসাছাত্রদের উস্কে দেয় বিএনপি-জামায়াত চক্র। এরপর জেলাজুড়ে তাণ্ডব চালায় বিএনপি-জামায়াত।

স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২৬ মার্চ মাদ্রাসাছাত্ররা ও বিএনপি-জামায়াত ক্যাডাররা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের গ্যারেজ, সিআইডির পুলিশ সুপারের গাড়ি, সিভিল সার্জন কার্যালয়, জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট কার্যালয়, সড়ক ও জনপথ (সওজ) কার্যালয়ে নিচতলা ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ছাড়া সার্কিট হাউসে থাকা সাত থেকে আটটি গাড়ি ও দুই নম্বর পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। ২৭ মার্চেও জেলার বিভিন্ন জায়গায় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়। এরপর হরতালের দিনে পুরো জেলাকে ধংসস্তুপে পরিণত করে দেশবিরোধী অপশক্তি।

জানা গেছে, ২৮ মার্চ হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতাল চলাকালে শতাধিক হেফাজত-শিবির-ছাত্রদল কর্মী শহরের কান্দিপাড় থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবে গিয়ে থামেন। এরপর হামলার করে জেলা পুলিশ লাইনসে। হামলাকারীদের হাতে ছিল লাঠি, রড ও শাবল। হামলাকারীরা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কার্যালয়ের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে গিয়ে ভাঙচুর চালান। থানা ভবনের সামনে এসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বড় হামলার শিকার হয় জেলা পরিষদ কার্যালয়। কার্যালয়টির নিচতলা থেকে ওপর তলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে যায় একটি সরকারি জিপ, আসবাব, কম্পিউটারসহ নথিপত্র। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে জেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং লাগোয়া ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ভাষাচত্বর হামলার শিকার হয়। সেখানে উন্নয়ন মেলায় অন্তত ৩০টি স্টল ভাঙচুর করেন এবং আগুন লাগিয়ে দেন হামলাকারীরা। চত্বরে ভেতরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের তিনটি কক্ষ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে প্রধান ফটক ভেঙে শিল্পকলা একাডেমিতে ঢোকেন হারতাল–সমর্থকেরা। শিল্পকলার বাদ্যযন্ত্র, আসবাব, সাউন্ড সিস্টেম বাইরে এনে আগুন ধরিয়ে দেন। পৌরসভা কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। নিচতলার গাড়ির গ্যারেজে থাকা দুটি সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়ার পর দ্বিতীয় তলায় মেয়র নায়ার কবিরের কক্ষ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় তলায় অবস্থিত অন্যান্য দপ্তরেও আগুন দেওয়া হয়।

হরতালকারীরা উগ্রপন্থীরা সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালান সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনে। হারতালকারীদের দেওয়া আগুনে পাঁচ শতাধিক স্টিলের চেয়ার, মঞ্চসহ সব আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একই সময়ে আগুন দেওয়া হয় সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে। আগুনে সেখানকার জাদুঘর, বাদ্যযন্ত্র, মিলনায়তন, শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কার্যালয় পুড়ে যায়। সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় পুড়ে দুপুর সাড়ে ১২টায়। দুই শতাধিক হরতাল–সমর্থক ভেতরে গিয়ে প্রথমে নথিপত্রে পেট্রল ঢালেন। পরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শহরের ট্যাংক পাড়ে অবস্থিত পানি উন্নয়ন বোর্ডে হরতাল–সমর্থকেরা ঢোকেন বেলা ১টার দিকে। তারা সেখানে একটি রেস্টহাউস ও দুটি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন। জেলা গণগ্রন্থাগারে আগুনে দেওয়া হয় বেলা দেড়টার দিকে। প্রেসক্লাব হামলার শিকার হয় দুপুর ১২টার দিকে। এ সময় প্রেসক্লাবের সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন এগিয়ে আসলে তার ওপর হামলা চালায় হরতালকারীরা। তার মাথায় ছয়টি সেলাই দিতে হয়েছে।

এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, হালদারপাড়া কালীবাড়ি মন্দির ও ব্যাংক এশিয়া কার্যালয়ে ভাঙচুর চলে। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল বারী চৌধুরী, বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত কার্যালয়, কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রয়াত আফজল হোসেন চৌধুরী, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ও পৌরসভার মেয়র বাসভবনের নিচতলার একটি দোকান ও দ্বিতীয় তলায় মেয়রের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি।

জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের প্রশ্ন, মহান স্বাধীনতার মাধ্যমে যে সাম্পদায়িক শক্তিকে পরাজিত করেছিল দেশবাসী সেই অপশক্তির কাছে কি আমরা পরাজিত হব? মৌলবাদীরা সুরের শহরকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। এই শক্তিকে মদত দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। ক্ষমতায় যেতে তালেবানি স্টাইলে হামলা চালিয়েছে। দেশকে এরা মধ্যযুগে নিয়ে যেতে চায়। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি হেফাজত-বিএনপি-জামায়াতের এই তাণ্ডব রুখে দিতে দেশের শান্তিপ্রিয়, অসাম্প্রদায়িক জনগণকে রাজপথে নেমে আসতে হবে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি