মঙ্গলবার ১১ মে ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 2 » ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়: বিএনপি সরকারের অব্যবস্থাপনায় দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু



২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়: বিএনপি সরকারের অব্যবস্থাপনায় দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
29.04.2021

ডেস্ক রিপোর্ট: এখনও সেই রাতের কথা মনে হলে আতঙ্কে শিউরে ওঠেন লুৎফুননাহার। হঠাৎ করে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা সহজে ভোলা যায় না। তাই সেই রাতের কথা এখনো ভোলেননি তিনি। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে থেকে ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে ৩১ বছর , কিন্তু ২৯ এপ্রিল দিনটি আজও তার কাছে ভয়ের স্মৃতিবাহী।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নে ছিল লুৎফুননাহারের বাড়ি। এলাকাটি বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা। তার বয়স তখন ১৩, স্কুলে পড়েন। এখন কক্সবাজার শহরে থাকেন তিনি। দুই সন্তানের এই মা আজও স্মরণ করতে পারেন, দিনটি মেঘলা ছিল। এলাকার বয়স্করা বলছিল, বড় ঝড় হতে পারে। এলাকায় তেমন কোন সতর্কবার্তা জারি করেনি সরকার। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য কোন জোরাজুরিও করেনি। ফলে লুৎফুননাহারের কাছেও তেমন বড় কিছু মনে হয়নি ওই ঝড়কে। তাই সে ঝড় যে এমন প্রলয়ংকরী হবে, ভাবতে পারেননি তিনি। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঝোড়ো হাওয়া বাড়তে থাকে। উথালপাতাল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে জনপদে। লুৎফুননাহারের পরিবারের সবাই টিনের ঘরের ওপর আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই দেখেন, পানির তোড়ে একের পর এক বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে পানির ধাক্কা লাগে তাদের ঘরেও। পানিতে ডুবে হাবুডুবু খেতে খেতে এক নারকেলগাছ আঁকড়ে ধরেন তিনি। কিন্তু পানির তোড়ে ঘর থেকে খুলে আসা এক টিনের ধাক্কা লাগে শরীরে। ক্ষতবিক্ষত হয় শরীর। ঢেউয়ের মধ্যে পড়ে যান। এরপর সারা রাত পানির সঙ্গে লড়াই।

গৃহিণী লুৎফুননাহার যখন এই কথাগুলো বলছিলেন তার কণ্ঠটি ভয়ার্ত, কিন্তু স্পষ্ট। তিনি বলছিলেন, ‌‘একটার পর একটা ঢেউ আসে। বাড়ির সবাই কই গেল, তখন আর কিছু মনে নাই। কেবল ভাবছিলাম, কতক্ষণ পর মারা যাব।’

ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে সেদিনের সেই কিশোরী লুৎফুননাহারের দেহটি আটকে যায় পাশের ইউনিয়ন মাতারবাড়ীর একটি চরে। সকালের দিকে একদল লোক এসে মনে করেছিল, লাশ পড়ে আছে। কিন্তু মেয়েটি বেঁচে আছেন দেখে আশ্চর্য হয় সবাই। আহত, বিপর্যস্ত কিশোরীকে নিয়ে যাওয়া হয় মহেশখালীর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে হাতের ক্ষতচিহ্নে সেলাই বাঁধা হয়। এক আত্মীয় এসে তাঁকে সেদিনই নিয়ে যান কক্সবাজার শহরে। শরীরের নানা জায়গায় আঘাতে লোনাপানি মিশে পচন ধরে গিয়েছিল। কক্সবাজারের হাসপাতালের চিকিৎসক হাতের সেলাই খুলে দেখেন, সেখানেও পচন ধরে গেছে। তিন দিন পর বাড়ির কিশোরীটি বাড়ি ফিরেছিল। কিন্তু ভাই, ভাবি, তাঁর ৪ সন্তান, ফুফুসহ ১৮ জনকে ১৯৯১–এর সেই ভয়াল রাতের ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছিল। কিশোরী এর কিছুই জানত না। সেই রাতে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগার ফলে বুকের ব্যথা আজও কষ্ট দেয়। বেশি কষ্ট স্বজন হারানোর। সেই রাত এমন অনেক মানুষকে স্বজনহারা করেছিল।

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের সেই রাত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলের মানুষের জন্য ছিল এক ভয়ানক রাত। ঘণ্টায় ২৪০ কিমি গতিবেগে বাতাস আর প্রায় ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস নিয়ে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ উপকূলে আছড়ে পড়ে হারিকেনের শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়। সরকারি হিসাবেই দক্ষিণ চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হয়েছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৯ জন। সম্পদ নষ্ট হয়েছিল কয়েক হাজার কোটি টাকার। কোন কোন হিসেবে বলা হয়, শক্তিশালী সে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার থেকে প্রায় দেড় লাখের মত মানুষ মারা যায়। প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন।

কেন এত মৃত্যু এবং সম্পদের ক্ষতি

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার লেমশাখালী গ্রামের কামরুন্নেসা সেসময় নববধূ। ১৯৯১–এর ২২ এপ্রিল বিয়ে হয়েছিল এ জেলার পেকুয়া উপজেলায়। তবে সে বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন কামরুন্নেসা। পরীক্ষা ছিল ২ মে। পরীক্ষা দিতে বাবার বাড়ি এসেছিলেন। কিন্তু ২৯ এপ্রিল রাতের ভয়াল ঝড় কামরুন্নেসার বাবা-মা, ভাবি, ভাই, তাঁদের ৪ সন্তানসহ ২০ জনকে নিয়ে যায়।

ভয়াবহ ঝড়ের সময় বাড়িতে কেন ছিলেন জানতে চাইলে কামরুন্নেসা বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ঝড় সম্পর্কে সঠিক ধারণা না পাওয়া। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে তেমন মাইকিং করা হয়নি। তাই এত ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় হবে আমরা বুঝতে পারিনি। আবার, কাছের আশ্রয়কেন্দ্রটিও ছিল বেশ দূরে। সে সময় নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তৎপরতা তেমন ছিল না।

কামরুন্নেসা বলেন, ‌‘এক ভয়ানক দিন। যার জীবনে আসবে না, তারা কোনো দিন বুঝবে না। আল্লাহ যেন এমন দিন কাউরে না দেয়।’

ভয়াবহ সেই ঘূর্ণিঝড়ে যে কেবল মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল তা নয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বিভিন্ন অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির।এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বন্দর , বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর জাহাজ। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান নষ্ট হয়েছিল।

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর কোয়ার্টারে ছিলেন তৎকালীন সার্জেন্ট উইং কমান্ডার এ কে এম নুরুল হুদা, যিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত।

তিনি বলেন, রাশিয়া থেকে সদ্য আমদানিকৃত চারটি বাক্স ভর্তি হেলিকপ্টার জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে রাস্তার উপর চলে আসে। এ হেলিকপ্টারগুলো ৫০০ গজ দুরে তালাবদ্ধ অবস্থায় হেঙ্গারে ছিল। পানি ও বাতাসের চাপে হেঙ্গার ভেঙ্গে গিয়েছিল। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিমান বাহিনীর ক্ষতি প্রচুর ছিল। বিমান বাহিনীর ৩০-৩৫টার মতো যুদ্ধ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ দুই বাহিনীর শতশত কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হয়।

প্রবল শক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার সতর্কবার্তা থাকলেও বিমান এবং নৌবাহিনীর সরঞ্জাম নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়নি। জানা গেছে, বাংলাদেশকে সামরিকভাবে পঙ্গু করে দিতেই বিএনপি সরকার এসময় সরঞ্জামগুলো নিরাপদে সরিয়ে নেয়নি। একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ জানান, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী না তৈরি করে পাকিস্তানের প্রতি নির্ভরশীল থাকা বিএনপির নীতি। তাই এত ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনীর ভয়াবহ ক্ষতির আভাস পেয়েও ব্যবস্থা নেয়নি বিএনপি সরকার।

ভয়াবহ এই ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু যখন বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিল, সেসময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সংসদে ঠোঁট উল্টিয়ে বলেছিলেন, ঘূর্ণিঝড়ে যত মরার কথা, তত মানুষ মরে নাই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি জন্ম থেকেই আমলাদের দল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাধারণ জনগণের প্রতি তাদের কর্মকাণ্ডে। কৃষক-শ্রমিকের প্রতি তাদের যেমন মায়া নেই তেমনি সাধারণ জনগণের জীবন নিয়েও তাদের চিন্তা নেই। তারা ব্যস্ত নিজেদের পকেট ভারী করতে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের অদক্ষতার কারণেই এত মৃত্যু হয়েছে। সরকার সময়মত পদক্ষেপ নিলে এত মৃত্যু এবং ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতো না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেন, সেসময় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার যদি সময়মত ব্যবস্থা নিত, পূর্বাভাস অনুযায়ী জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিত এত মানুষের মৃত্যু হত না। ঘূর্ণিঝড় প্রাকৃতিক, কিন্তু ব্যবস্থাপনা মানুষের হাতে থাকে। সরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে মানুষের মৃত্যু কমত, হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাঁচত।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি