মঙ্গলবার ১১ মে ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে জালিয়াতি করে কোটিপতি সাজা পিনাকীই দেন নৈতিকতার সবক!



জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে জালিয়াতি করে কোটিপতি সাজা পিনাকীই দেন নৈতিকতার সবক!


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
29.04.2021

ডেস্ক রিপোর্ট: অনলাইন মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই সরকারের বিরুদ্ধে নানারকম অপপ্রচার এবং বিকৃত তথ্য সরবরাহ করে আলোচনায় থাকেন ফ্রান্সে বসবাসরত ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য। নিজেকে পরিচয় দেন লেখক এবং ব্লগার হিসেবে। সরকারের বিরুদ্ধে প্রায়ই নানা রকম উস্কানিও দেন। জনগণকে নৈতিকতার সবক দিতেও দেখা যায় তাকে। কিন্তু তার আসল পরিচয় কি? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনলাইনে সাধু সেজে জনগণকে নৈতিকতার সবক দেওয়া এই পিনাকী ভট্টাচার্য একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ এবং বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প জগতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক জালিয়াত।

সূত্র জানায়, দেশত্যাগের আগে পিনাকী পপুলারের চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে কাজ করতেন পপুলার ফার্মাসিটিক্যালসে। ২০০৮ সালে ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য পপুলারের মাধ্যমে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ জালিয়াতি করে কয়েক কোটি টাকা লুটপাট করে। তার এই জালিয়াতির সাথে যুক্ত ছিল বিএনপি-জামায়াতের আমলে নিয়োগ পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। পিনাকীর এই অপকর্ম ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে তখন তেমন কোন আলোচনা হয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, যেই পিনাকী ভট্টাচার্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে জালিয়াতি করে কোটিপতি হয়েছে, সেই পিনাকীই আজকে সবাইকে নৈতিকতার সবক দেয়।

পিনাকীর এই জালিয়াতির বিষয়টির আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন ভাইরোলজিস্ট ডা.জাহেদুর রহমান। এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ডা.জাহেদুর রহমান জানান, ২০০৮ সালের মে মাসে কালাজ্বর নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশে কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বিনামূল্যে পপুলারের তৈরি ক্যাপস্যুল মিল্টেফস (মিল্টেফসিন) বিতরণ শুরু করে। ঋণ হিসেবে টাকাটা দেয়ার কথা ছিল ডব্লিউএইচওর, কিন্তু শর্ত ছিল যেসব ওষুধ কেনা হবে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঐ ওষুধ উৎপাদনের কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা লাগবে।

ডা.জাহেদুর রহমান লিখেছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টেন্ডার দিলে দুটি কোম্পানি আবেদন করে, একটি জার্মানির ইটার্না জেন্টারিস অপরটি বাংলাদেশের পপুলার। প্রথমটির তৈরি মিল্টেফসিন ছিল মানসম্মত, পরীক্ষিত, তাদের উৎপাদনের অভিজ্ঞতাও ছিল দুই বছরের বেশি। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পপুলারের তৈরি মিল্টেফসিন কেনে, যাদের এই ওষুধ তৈরির কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।

জানা গেছে, এই কেনাকাটায় বিএনপি-জামায়াতের আমলে নিয়োগ পাওয়া পিনাকীর ঘনিষ্ঠ কয়েক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। কোন অভিজ্ঞতা না থাকলেও পিনাকী তাদের ১ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে টেন্ডার পাশ করায়। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, পপুলারের মিল্টেফসের মধ্যে মিল্টেফসিনেরই কোন অস্তিত্ব নাই। এরকম মোটা দাগের দুর্নীতি দেখে ডব্লিউএইচও তাদের ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়।

ডা.জাহেদুর জানান, শুধুমাত্র পপুলারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আবারও টেন্ডার ডাকে এবং দুই বছরের অভিজ্ঞতার শর্তটি তুলে নেয়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিএনপি-জামায়াতপন্থি ওই কর্মকর্তাদের প্ররোচনায় পপুলারের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকার কালাজ্বরের ক্যাপসুলের কেনা হয়। পপুলারের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি দেখভাল করে প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার পিনাকী ভট্টাচার্য। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েকশো রোগীকে পপুলারের তৈরি মিল্টেফসিন ফুল ডোজে খাওয়ানোর পরও তাদের জ্বর কমেনি, পরীক্ষা করে তাদের সবার দেহেই আবার কালাজ্বরের জীবাণু পাওয়া গিয়েছিল। অথচ জার্মানির তৈরি একই ওষুধ খেয়ে আগের সব রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছিল। ওই সময় পরীক্ষা করে জানা যায়, পপুলারের তৈরি মিল্টেফসিন ক্যাপসুলের মধ্যে ড্রাগই ছিল না। শুধু ময়দা দিয়ে এই ক্যাপসুল তৈরি করা হয়। আর এই প্রক্রিয়ার পুরোটাতে সামনে থেকে তদারকি করে পিনাকী ভট্টাচার্য।

জালিয়াতি ধরা পড়লে পিনাকী ভট্টাচার্য অবশ্য তখন তার স্বভাবসুলভ ভণ্ডামি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে পপুলারের ওষুধ মানসম্মত। অথচ ডব্লিউএইচও নেদারল্যান্ড থেকে পরীক্ষা করিয়ে প্রমাণ করে পপুলারের তৈরি কালাজ্বরের মিল্টেফস ক্যাপসুল সম্পূর্ণভাবে মিল্টেফসিনবিহীন! অবস্থা বেগতিক দেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পপুলারের মিল্টেফস ক্যাপসুল সরবরাহ বন্ধ করে এবং এই ওষুধের সব ধরনের উৎপাদন এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

বিষয়টি নিয়ে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে তারা জানায়, ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় মিল্টেফস আমদানি করা হলেও জালিয়াত চক্রের অন্যতম হোতা তৎকালীন পপুলারের সিইও পিনাকী ও ফ্যাক্টরি ম্যানেজার শাহজাহানের যোগসাজশে নকল ও ভেজাল ঔষধ তৈরি করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ২০০৮ সালে আমি বিষয়টি শুনেছিলাম। তখন পিনাকীকে চিনতাম না। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেসময় এটা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি। এখন তো দেখি পিনাকী সবসময় ফেসবুকে সরকারবিরোধী কথা বলে। নৈতিকতার বয়ান দেয়। কিন্তু জেনেশুনে জীবন রক্ষাকারী কোন ওষুধ নিয়ে মানুষের সাথে এরকম প্রতারণা করার পর পিনাকী কীভাবে মানুষকে ভালো মন্দের সবক দেন আমি বুঝি না। আমি নিজেও সরকারের সমালোচনা করি। কিন্তু তার মানে এই নয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা করা পিনাকী সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললেই তাকে ভালো মনে করতে হবে। আসলে পিনাকী লেবাস ধরেছে, যেমন হেফাজতের নেতারা ধর্মের লেবাস ধরেন। পিনাকীর এই প্রতারণার বিষয়ে দুদকের তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানান ডা. জাফরুল্লাহ।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি