শুক্রবার ২৫ জুন ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 2 » বিএনপির কারণে বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারাচ্ছে ব্রিটেন



বিএনপির কারণে বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারাচ্ছে ব্রিটেন


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
08.06.2021

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার বিবেচনায়, ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন হাজারো নেতা। এছাড়া অসংখ্য নেতা দিয়েছেন বিদেশে পাড়ি। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য শতাধিক বিএনপি কর্মী বার বার ধরনা দিচ্ছেন দেশটির এম্বাসিতে। যার কারণে প্রবাসী বাঙালিদের ওপর ব্রিটেন সরকার আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার। সূত্র বলছে, সম্প্রতি বিএনপির একাধিক নেতা ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করছে।

জানা যায়, অনুমোদিত মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করার সন্দেহে এবং চুরির দায়ে এক বাংলাদেশিকে ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করেছিল যুক্তরাজ্য পুলিশ। এর পর থেকে তার নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। ওই গ্রেপ্তারের তিন বছরেরও বেশি সময় পর ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল হঠাৎ তিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চেয়ে বসেন। আবেদনে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে তিনি বিএনপি করতেন। সিলেট অঞ্চলের একটি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতিও ছিলেন তিনি। দেশের একটি ফৌজদারি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। হুমকির মুখে এ দেশে তার পরিবারও ঘরছাড়া। দেশে ফিরলে তার জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর ওই ব্যক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি অভিবাসনসংক্রান্ত উচ্চ আদালতেও আবেদন করেছিলেন। সেখানেও তা খারিজ হয়েছে। যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য তার মতো অর্ধশতাধিক বাংলাদেশির আবেদনের বিষয়ে আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য কিছু ব্যক্তি নিজেদের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, বিশেষ করে বিএনপির কর্মী এবং বাংলাদেশে ফেরা তাদের জন্য বিপজ্জনক বলে দাবি করছে।

বেশির ভাগ মামলার রায় হয়েছে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। কিছু মামলা নতুন করে শুনানির জন্য অন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশে কারাগার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নাজুক থাকার অজুহাত দেখিয়েও অনেকে ফেরত না পাঠানোর আবেদন করেন।

এই প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা ব্যক্তির মামলাটি এতই স্পর্শকাতর যে আদালতের নির্দেশে মামলার নথিতে তার নাম, এমনকি ছদ্মনাম বা নামের আদ্যক্ষরও উহ্য রাখা হয়েছে। আশ্রয়ের জন্য গত বছরের ২৬ জুন যুক্তরাজ্যের উচ্চতর ট্রাইব্যুনালে (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম চেম্বার) শুনানিতে অংশ নেওয়া আবেদনকারীর জন্ম ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে। ১৮ বছর বয়সে তিনি ভিজিটর (দর্শনার্থী) ভিসায় ব্রিটেনে গিয়েছিলেন। তার ভিসার মেয়াদ ছিল ২০১২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। আশ্রয়ের আবেদনে তিনি নিজেকে বিএনপির একজন সদস্য বলে দাবি করেন। তার আরো দাবি, ২০১০ সালে তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন এবং ক্রমেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর বিএনপির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কমেছে। তবে বাংলাদেশে তার পরিবার বিএনপিতে সক্রিয়।

ওই আবেদনকারী তার আবেদনে জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ সদস্যরা তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। তার খোঁজে তার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে তার ভাইয়েরা আত্মগোপনে চলে গেছে। বোনের পড়ালেখাও বন্ধ। আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাকে হত্যার চেষ্টাও করেছিল বলে দাবি করে ওই ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চান।

এদিকে ওই ব্যক্তির পক্ষে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি চিঠি দিয়ে তাঁকে যুক্তরাজ্যে তাঁর দলের সক্রিয় কর্মী বলে দাবি করেছিলেন। অথচ আবেদনকারীই আদালতকে বলেছেন যে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর নানা কারণে তিনি বিএনপিতে সক্রিয় থাকতে পারেননি। বিচারক এ সম্পর্কে লিখেছেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি যদি ওই আবেদনকারী সম্পর্কে সত্যিই জানতেন বা কখনো সরাসরি দেখা করতেন, তবে তিনি বুঝতে পারতেন যে ওই ব্যক্তি কোনোদিন বিএনপি করেননি।

আরেকটি মামলার রায়ে দেখা যায়, ইংরেজিতে ‘এস এইচ’ আদ্যক্ষরের এক বাংলাদেশি ১৯৯৮ সালে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে আশ্রয় চেয়েছিলেন। তারও দাবি, তিনি বিএনপি করতেন এবং এ কারণেই আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দেয়। এক মামলায় তার সাত বছরের সাজাও হয়েছে। দেশে ফিরলে তিনি হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হবেন বলে তার আশঙ্কা।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাকে আশ্রয় দেওয়ার যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি। এর বিরুদ্ধে ‘এস এইচ’ যখন (২০০৪ সালে) যুক্তরাজ্যের অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন, তত দিনে বাংলাদেশে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। এর পরও ফেরার আগ্রহ না দেখিয়ে বরং এ দেশের কারাগারে নির্যাতন হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় চান তিনি। ব্রিটিশ ট্রাইব্যুনালে ‘এস এইচ বনাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ মামলায় বাংলাদেশের কারাগার পরিস্থিতি এবং ঝুঁকিও বিশ্লেষণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘এস এইচ’ তাকে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেননি। এ কারণে মানবাধিকারের অজুহাতে তিনি আশ্রয় পেতে পারেন না।

২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের উচ্চতর আদালত (অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনাল) শামসুল হক নামের এক বাংলাদেশির আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনিও নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করে উল্লেখ করেছিলেন, দেশে ফিরলে রাজনৈতিক কারণে তাকে হত্যা করা হতে পারে। তবে আদালত রায়ে বলেছেন, মানবিক কারণে আশ্রয়ের জন্য শামসুল হকের যুক্তিগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১৩ সালের ৫ জুলাই যুক্তরাজ্যের উচ্চতর আদালতের (অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনাল) আরেক রায়ে আবদুল হান্নান নামের এক বাংলাদেশির আশ্রয়ের আবেদন খারিজ হয়। তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, তিনি একটি হত্যা মামলার সাক্ষী। এ কারণে আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাকে হুমকি দিচ্ছে। বাংলাদেশে ফেরা তার জন্য বিপজ্জনক। তবে আদালত রায়ে বলেছেন, বাংলাদেশে ফিরলে জীবন হুমকিতে পড়ার দাবি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন আবদুল হান্নান।

সর্বশেষ ২০২১ সালের ৭ জুন, এক রায়ে বিএনপির কর্মী বলে দাবি করা ‘এস এ’ নামের (আদ্যক্ষর) এক ব্যক্তির যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনিও দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ফিরলে তার জীবন বিপন্ন হবে। যুক্তরাজ্যের আদালত ওই দাবি গ্রহণ করেননি।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি