রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১



‘মাদার তেরেসা’, ‘প্রবাসী মাতা’র আড়ালে একজন প্রতারক হেলেনা জাহাঙ্গীর


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
01.08.2021

নিউজ ডেস্ক: নামের সাথে কখনো ‌’মাদার তেরেসো’, কখনো ‌’পল্লী মাতা’ আবার কখনো বা ‘প্রবাসী মাতা’ কিংবা ‘সিস্টার হেলেন’ যুক্ত করে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি বাড়িয়েছেন হেলেনা আক্তার জাহাঙ্গীর। আর এই পরিচিতি কাজে লাগিয়েই করেছেন প্রতারণা, চাঁদাবাজি। হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

নিজেকে দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতা। বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ছাড়া কোনো মন্ত্রী মিনিস্টার গোনার সময় আমার নাই’। স্বার্থের জন্য এমন সব উদ্ধ্যত বক্তব্য সঙ্গে অর্থ ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রায় ২৭ জন ব্যক্তিকে নিজের ট্র্যাপে ফেলেছেন।

নানা ছুতোই হেলেনা ওইসব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক করেন। ধীরে ধীরে সম্পর্ক গভীর করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করতেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, চিকিৎসক, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ একাধিক পেশাজীবী লোকজন। নিজেদের মান-সম্মানের ভয়ে তারা কাউকে এতোদিন কিছু বলতে পারেননি। চেপে গেছেন বিষয়টি।

আইপি টিভি জয়যাত্রা টেলিভিশনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক নিয়োগসহ বিভিন্ন সময় প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর। কারও কাছ থেকে ২০ হাজার, কারও থেকে ৩০ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছেন প্রতারক হেলেনা জাহাঙ্গীর। এমনকি প্রতারণার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত চাইলে মিডিয়ায় প্রচার করার হুমকি দিতেন তিনি।

শুক্রবার (৩০ জুলাই) র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাদির শাহ বলেন, জয়যাত্রা টেলিভিশনের কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। যদিও সম্প্রচার চ্যানেল হিসেবে যা যা থাকা দরকার, তার সবকিছুই রয়েছে।

এতদিন তার রূপের এই কালো দিকটা আড়ালে ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পরপর কয়েকটি অভিযোগ আসায় শুরু হয় তদন্ত। এরপরই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। গুলশানের বাসায় অভিযান চালানোর পর মুখোশ উন্মোচিত হয় তার।

বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) রাতে গুলশানের বাসা থেকে বিদেশি মদ, অবৈধ ওয়াকিটকি সেট, ক্যাসিনো সরঞ্জাম ও হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়। এরপর র‌্যাব তার মিরপুরে জয়যাত্রা টিভি ও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে অভিযান চালায়। যে আইপি টেলিভিশনে বিভাগ-জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগের কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, হেলেনা জাহাঙ্গীর একজন বহুমুখী প্রতারক। তার বিশাল সম্পদের উৎস কি এবং কোন আয় থেকে এত সম্পদ অর্জন করেছেন তা নিয়ে তথ্যানুসন্ধান চলছে।

জানা যায়, র‌্যাব’র মাঠ পর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা তার ১৫টি একক মালিকানাধীন ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে- উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ৫ তলা ভবনে ৫ টি, গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর রোডে ৫ নম্বর বাড়িতে ৫টি, গুলশান-২ এর ৮৬ নম্বর রোডে ৭/বি নম্বর বাড়িতে ১ টি, গুলশান এভিনিউয়ে ১টি, গুলশান নিকেতনে ১টি, মিরপুরের ১১ নম্বরের ৬ নম্বর রোডে ১টিসহ মিরপুরের কাজীপাড়ায় ১টি। এছাড়াও গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় ১০০ একর জমির সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব। সেই জমি তিনি আরেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যৌথ মালিকানাধীন হয়ে কিনেছেন।

হেলেনা প্রথমে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিলেও তার আয়ের সঙ্গে সম্পদের পরিমাণ মিলাতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, হেলেনা অনেক ভিআইপির সঙ্গে ছবি তুলেছেন। সেই সব ছবি তার টার্গেট করা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দেখিয়ে বলতেন- ‘ওনাদের সাথে আমার দহরম-মহরম সম্পর্ক, যেকোনো কাজ আদায় করে দিতে পারবো’। তার এ সব কথায় অনেক শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা খুইয়েছেন।

এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, নিজ এলাকা কুমিল্লায় নেতাকর্মীদের মাঝে তিনি টাকা ছিটিয়ে গ্রুপিং সৃষ্টি করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল, ওই এলাকায় কোন্দল লাগিয়ে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিতসহ প্রভাব বিস্তার করা।

উল্লেখ্য, দেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এফবিসিআই-এর সাবেক পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীর সম্প্রতি সমালোচনায় আসেন ‘আওয়ামী চাকুরীজীবী লীগ’ এর সভাপতি পরিচয় দিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানানোর মাধ্যমে। ভুঁইফোড় এই সংগঠনে সংযুক্তির কারণে ২৫ জুলাই তাকে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি