বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » ১৪ মামলার জালে ওসি প্রদীপ, ৩০ খুনের ঘটনা তার গুলিতেই



১৪ মামলার জালে ওসি প্রদীপ, ৩০ খুনের ঘটনা তার গুলিতেই


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
23.08.2021

নিউজ ডেস্ক: অত্যাচার-নির্যাতন ও বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যার একের পর এক অভিযোগ উঠছে টেকনাফের বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে। মাদক নির্মূলের নামে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ইয়াবা ব্যবসার গুরুতর অভিযোগও। মায়ের সামনে ছেলেকে, বোনের সামনে ভাইকে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে ধরে নিয়ে ‘খুন’ করে গেলেও এতোদিন প্রদীপের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পেতো না। একবছর আগে কক্সবাজারের স্থানীয় এক সাংবাদিক প্রদীপের অত্যাচারের বিবরণ দু কলম লেখার পরেই দফায় দফায় নির্যাতন চালিয়ে রীতিমতো পঙ্গু করে সাজানো মামলায় পাঠানো হয়েছে কারাগারে। পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে পুরো টেকনাফেই রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেন ওসি প্রদীপ।

মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যার ঘটনায় বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এখন ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। অনেকেই এখন সাহস করে আশ্রয় নিচ্ছেন আইনের। ফলে প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের আদালতে প্রদীপের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মোট ১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর বেশিরভাগই করা হয়েছে প্রদীপ ও তার বাহিনীর হাতে বিভিন্ন সময়ে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে। দেখা গেছে, চাহিদামতো টাকা না পেয়েই প্রদীপ হত্যা করেছেন অনেককে। আবার টাকা নিয়েও হত্যা করেছেন অনেককে।

তবে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে এভাবে মামলা হওয়ায় পুলিশের অনেকে অসন্তুষ্ট। গত ৮ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে আগামীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি মামলা করলে সেটি যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ না করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সুপারিশ জানানো হয়েছে।

শুধু প্রদীপের আমলেই টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে ১০৬টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭৪ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার ঘটনা তদন্তে গঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কমিটির সদস্যদের সামনে প্রদীপ নিজেই স্বীকার করেছেন, বন্দুকযুদ্ধগুলোর বেশিরভাগই তার নেতৃত্বে হয়েছে। কমিটি জানতে চেয়েছিল, আপনি কতবার নিজে গুলি করেছেন, কী অস্ত্র দিয়ে গুলি করেছেন? জবাবে প্রদীপ বলেছেন, তিনি ২০-৩০ বার গুলি করেছেন, ব্যক্তিগত অস্ত্র দিয়ে। প্রদীপের কাছে কমিটি জানতে চায়, আপনি কি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, নাকি অধীনস্থদের পেছনে থাকেন? জবাবে প্রদীপ বলেন, ‘আমি সামনে থেকেই পরিচালনা করি।’

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সবশেষ ওসি প্রদীপসহ ৫৬ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের আদালতে দুটি মামলা করা হয়। দুটি মামলাই কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত। বন্দুকযুদ্ধের নামে আবদুল আমিন ও মফিদ আলমকে হত্যার অভিযোগে ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৫৬ জনের বিরুদ্ধে পৃথক এই দুটি মামলা হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ নাটকে নিহত আবদুল আমিন নিহতের ঘটনায় বাদী তার ভাই টেকনাফের বাহারছড়ার নুরুল আমিন এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তার ভাই আবদুল আমিনকে আটক করে পুলিশ। এরপর ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দেওয়ার পরও ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে হত্যা করা হয় আবদুল আমিনকে। এ মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৮ জনকে। যার মধ্যে ৩০ জন পুলিশ সদস্য। অন্যদিকে মফিদ আলম নিহতের ঘটনায় বাদী তার ভাই টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের মোহাম্মদ সেলিম এজাহারে বলেছেন, ২০১৯ সালের ১১ জুলাই তার ভাইকে আটক করা হয়। এরপর দাবি করা ১৫ লাখ টাকার মধ্যে ৬ লাখ টাকা দেওয়ার পরও ১৪ জুলাই হত্যা করা হয় মফিদ আলমকে। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৮ জনকে। যার মধ্যে ১৬ জন পুলিশ।

সাম্প্রতিক সময়ে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি হয় গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যার ঘটনায়। সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে দায়ের করা হত্যামামলায় ২ নম্বর আসামি প্রদীপ কুমার দাশ। ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর প্রদীপকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় আদালতে হাজির করাতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে তাকে কক্সবাজার কারাগার থেকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়।

এদিকে গত ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চন্দনাইশের দুই ভাই আমানুল হক ফারুক ও আজাদুল হক আজাদকে অপহরণ করে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে না পেয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগে ওসি প্রদীপসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমীর আদালতে নিহতের ছোট বোন রিনাত সুলতানা শাহীন মামলাটি করেন। চন্দনাইশ থানার ওসি কেশব চক্রবর্তীর যোগসাজশে প্রদীপ ওই দুই ভাইকে তুলে নিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ করে আসছিলেন নিহতদের স্বজনরা। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

৮ সেপ্টেম্বর প্রদীপ কুমার দাশসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন প্রদীপের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান। সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের দায়ের করা মামলায় ওসি প্রদীপসহ পুলিশ সদস্য ও তাদের দালালদের মাধ্যমে পৃথক চার দফা ঘটনায় নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা ও মিথ্যা মামলা দায়েরসহ নানা অভিযোগে আনা হয়েছে। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

৭ সেপ্টেম্বর টেকনাফের নূর মোহাম্মদ ও মো. আজিজ নামে দুই ব্যক্তিকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগে কক্সবাজারের আদালতে দুটি মামলা করা হয়। নূর মোহাম্মদের স্ত্রী লায়লা বেগম ও মো. আজিজের মা হালিমা খাতুন বাদি হয়ে মামলা দুটি করেন। এতে ওসি প্রদীপসহ ৩১ জনকে আসামি করা হয়।

২০১৯ সালে টানা ৬ মাস থানায় আটকে রেখে ৬ লাখ টাকা আদায় করেও পরে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয় অটোরিকশাচালক জলিলকে। এই ঘটনায় গত ২৭ আগস্ট ওসি প্রদীপসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের আদালতে মামলা করেন অটোরিকশাচালক জলিলের স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম।

৫ লাখ টাকা আদায় করে আরও ৫ লাখ টাকা ঘুষ না পাওয়ায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলার যুবক সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করেন ওসি প্রদীপসহ ২৮ জন— এ অভিযোগে গত ১৮ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহতের মা গুল চেহারা। আদালতের বিচারক এজাহার আমলে নিয়ে একজন এএসপি পদমর্যদার অফিসারকে দিয়ে তা তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

৫ লাখ টাকা আদায় করে দাবিকৃত আরও ৫ লাখ টাকা না দেওয়ায় টেকনাফের প্রবাসী মাহামুদুল হককে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ তার বাহিনী। এ মামলায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে এজাহার দায়ের করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের মিয়া হোসেনের ছেলে নুরুল হোছাইন (৪৫) বাদী হয়ে মামলাটি করেন। আদালত এজাহারটি পর্যালোচনা করে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাহামুদুল হক নিহতের ঘটনায় টেকনাফ থানায় দায়ের করা মামলার বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দিয়েছেন।

টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে একসঙ্গে তিনজনকে হত্যার অভিযোগ এনে ওসি প্রদীপকে প্রধান আসামি করে গত ৩১ আগস্ট ৪১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা করেন টেকনাফের রঙ্গিখালীর বাসিন্দা সুলতানা রাবিয়া মুন্নী (২২)। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তার স্বামী সৈয়দ আলম, সৈয়দ আলমের আপনভাই নুরুল আলম ও তাদের ভাগিনা সৈয়দ হোসেনকে গত ৬ মে রাত দুইটায় নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় মামলায় উল্লেখিত আসামিরা। পর ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও এসআই মশিউর রহমান ওই তিন জনের পরিবারের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় একই দিন রাত চারটা ৪০ মিনিটে ওই তিন জনকে তাদের বসতবাড়ির পশ্চিম পাশে পাহাড়ের নিচে ধানক্ষেতে নিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে অভিযুক্ত আসামিরা যোগসাজশে গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া আসামিরা তিনজনের বাড়িতে গভীর রাতে সশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করে লুটপাট, ভাঙচুর ও বাড়ির মানুষদের মারধর করে।

আদালত এজাহারটি আমলে নিয়ে এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ইতোমধ্যে কোনো মামলা হলে তার সর্বশেষ অবস্থা ও অগ্রগতির প্রতিবেদন ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে টেকনাফ থানার ওসিকে আদেশ দিয়েছেন।

গত ২৩ আগস্ট প্রদীপ কুমার দাশ ও তার স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দীন। এ মামলায় ২৭ আগস্ট মহানগর সিনিয়র স্পেশাল দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের আদালতে প্রদীপ কুমার দাশকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জমা দেওয়া হয়। আদালত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আদেশের শুনানির জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন। মামলার এজাহারে প্রদীপ কুমার দাশ ও চুমকি কারণের বিরুদ্ধে প্রায় চার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকা ওসি প্রদীপ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন বলে দুদক অভিযোগ এনেছে। আরও ১৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য বিবরণীতে গোপন করার অভিযোগও আনা হয়েছে চুমকির বিরুদ্ধে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি