মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল চর্চা থাকলে সিনহা খুন হতেন না



জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল চর্চা থাকলে সিনহা খুন হতেন না


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
23.08.2021

নিউজ ডেস্ক: শুদ্ধাচার কি? শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ বোঝায়। এর দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদন্ড,নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্যও বোঝানো হয়। ব্যক্তিপর্যায়ে এর অর্থ হল কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা,তথা চরিত্রনিষ্ঠা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ অক্টোবর ২০১২ ’সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ নামে ৫৬ পৃষ্টার একটি দলিল এর চুড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করেছে। উক্ত দলিলে প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেছেন, ” সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে আলোকে আইনকানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তাদের বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করা হচ্ছে। কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবিচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহন প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসাবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশলটি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান,সুশীল সমাজ এবং বেসরকারী শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহন প্রয়োজন। চরিত্রনিষ্ঠা আনায়নের জন্য মানুষের জীবনের একেবারে গোড়া থেকে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই কার্যক্রম গ্রহন করতে হবে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছি। রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে হবে। আমরা সবাইকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানাই।”

গত ১৩/২/১৫ইং তারিখ মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ ও জাইকার উদ্যোগে ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ’জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের’ উপর জনসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উক্ত অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্র পেয়ে জানতে পারলাম কর্মসুচীতে ১০ মিনিট সময় রাখা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিটির কার্যক্রমের ওপর আলোচনার জন্য। আমাদের আছে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, দুর্নীতি দমন কমিটি নয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির আইনী দায়িত্ব হল দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করতে,বর্জন করতে উদ্ভুদ্ধ করা। অনুষ্ঠানের আগের দিন একজন এডিসি ফোন করে তার অফিসে গিয়ে রিয়ার্সাল দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসার অজিত দাশ গিয়ে দেখা করে আমাদের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে অতিথিদের সামনে কি বলা হবে, কি কি ছবি প্রজেক্টারে দেখানো হবে তা দেখালে কিছু বাদ দিয়ে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং অনুষ্ঠানে তা পড়া হয় ও দেখানো হয়।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, বিশেষ অতিথি ছিলেন এন,এম,জিয়াউল আলম, সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ ও মোঃ রুহুল আমীন, বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম বিভাগ। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার জেলা প্রশাসকসহ কক্সবাজার জেলার সকল প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধানরা,পৌরসভার মেয়র,উপজেলা চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও এনজিও প্রতিনিধিসহ ৮৫জন উক্ত সেমিনারে অংশ গ্রহন করেন। অনুষ্ঠানে জাপান থেকে আগত জাইকার প্রতিনিধি ও বাংলাদেশে জাইকার উপদেষ্টা সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও (কক্সবাজারের সাবেক ডিসি) উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বান্দরবান জেলার জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বনিক, ইর্নোভেশন সার্কেল চট্টগ্রামের সমন্বয়ক দীপক চক্রবর্তী,কুমিল্লা জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল,কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ কামরুদ্দিন,কক্সবাজার জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক আহমদ চৌধুরী,কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট আহমদ হোছাইন,কক্সবাজার সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ একেএম ফজলূল করিম চৌধুরী,সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকা,ইঞ্জিনিয়ার কানন পাল,কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবুর রহমান,মহেষখালী পৌরসভার মেয়র মকসুদ মিয়া,কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জি,এম রহিমউল্লাহ দুর্নীতি বিরোধী ও শুদ্ধাচারের উপর বক্তৃতা করেন।

কক্সবাজার সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ সাহেব আপসোস করে বলেন, এখনকার ছাত্রছাত্রীদের অনেকে শিক্ষকদের সালাম পর্যন্ত করে না যা শুদ্ধাচারের পরিপন্থী। সাধারণত আদবকায়দা স্কুল কলেজে নয়,পরিবার থেকে শিক্ষা দেওয়া হয়। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি তার জীবনের সেরা বক্তৃতা দিয়ে বলেন, আমি নিজেও সম্পূর্ণ শুদ্ধ নই, মাত্র পঞ্চাশ ভাগ শুদ্ধাচারের মধ্যে আছি দাবী করে বলেন, অদ্যকার সেমিনারের প্রধান অতিথি আমার এলাকার ছেলে হিসেবে ছোট বেলা থেকেই তাকে চিনি। তিনিই একমাত্র শতভাগ সততা নিয়ে চলেন এবং সম্পূর্ণ শুদ্ধাচারের মধ্যে আছেন। সরকারী কর্মকর্তারা ও আমরা যদি উনাকে অনুসরণ/অনুকরণ করি তবেই শুদ্ধাচার সম্পর্কে এই প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানটি সার্থক ও সফল হবে। প্রধান অতিথি মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ সফিউল আলম বলেছেন,সুশাসন নিশ্চিত করতে শুদ্ধাচার প্রয়োজন। শুদ্ধাচার ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত,সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।

আমি মুক্ত আলোচনায় অংশ গ্রহন করে বলেছি, আমি কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হিসেবে আমাদের বিগত দিনের কার্যাবলী বলতে গেলে তিন ঘন্টা সময় লাগবে। আমি পেশায় একজন আইনজীবী হলেও নেশায় একজন কলাম লেখক। পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে একটি কলাম লেখা, বিশেষ করে দুর্নীতি বিষয়ক,আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই সময় বাচাঁনোর জন্য কক্সবাজার জেলায় দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির বিগত দিনের কার্যাবলীর উপর ধারণা দেওয়ার জন্য আমার লেখা ও স্থানীয় ’দৈনিক কক্সবাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি কলাম সংকলন করে প্রধান অতিথির অনুমতি নিয়ে আগত অতিথিদের মধ্যে বিতরণ করি। বইটি পড়ে কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক ও সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব জাইকার উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার সাহেব সন্তোষ প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ও দায়িত্ব হল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন,মৌলিক মানবাধিকার,সমতা,ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করে। এক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য কৌশল হল সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা এবং দেশে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা। তবে সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণ প্রবণতা রাষ্ট্রের উক্ত লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহল প্রথম থেকেই আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যা এখন সত্য প্রমানিত হচ্ছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ অক্টোবর ২০১২ ’সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ নামে ৫৬ পৃষ্টার একটি দলিল এর চুড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করার পর তার ওপর আমলা,জনপ্রতিনিধি,রাজনৈতিক নেতা,সাংবাদিক,সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনেক সেমিনার, আলোচনা সভা, শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হল, কর্মক্ষেত্রে দেশে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের চর্চা না থাকায় শুধু টেকনাফ থানায় ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে ১০৬টি কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৭৪জন মানুষ হত্যা করা হলেও ইয়াবা পাচার বন্ধ হয় নাই। বরং দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্ত্রীসহ ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে দুদককে মামলা দায়ের করতে হয়েছে। পুলিশকর্তৃক নির্দেশিত হয়ে গাড়ী থেকে দুই হাত উপরে তুলে নামার পরও অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে খুন হতে হয়েছে। দেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক মালেক ড্রাইভার, আবজল, সম্রাট, জি,কে শামীম, পাপিয়া, সাবরিনা, সাহেদ, মিঠু গং সৃষ্টি হয়েছে ও ফরিদপুরের ছাত্রলীগের সভাপতির মত বাচ্চা ছেলেও দুই হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যম প্রচার করছে। দেশে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের বাস্তবায়ন হলে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার থেকে কনষ্টেবল পর্যন্ত ১৪৮৭ জনকে তীব্র সমালোচনার মুখে এক সপ্তাহের মধ্যে অন্যত্র বদলী করে ইতিহাস সৃষ্টি করতে হতো না। উল্লেখিত ঘটনাগুলির মাধ্যমে প্রমানিত হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া শুধু প্রচার-প্রচারণা ও গলাবাজি করে দুর্নীতি দমন করা ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি