মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » সিনহা হত্যা: আইনজীবী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রয়োজন



সিনহা হত্যা: আইনজীবী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রয়োজন


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
23.08.2021

নিউজ ডেস্ক: আমার এক বন্ধু কক্সবাজার জেলার সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার ও সিনিয়র আইনজীবী আমাকে বলেন, তাকে অবসরপ্রাপ্ত সিনহা হত্যা মামলার বাদীপক্ষে ফোন করা হয়েছিল মামলায় বাদীপক্ষে আইনজীবী হিসেবে থাকার জন্য। ও/সি প্রদীপসহ আসামীরা সকলে পুলিশ বিধায় আমি কোন পক্ষে থাকতে পারব না বলে জবাব দিয়েছি। আমি কেন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করলে তারা প্রতিশোধ নেন, মিথ্যা মামলায় জড়িত করে দেন। গ্রেপ্তার করেন, হয়রানী করেন। পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার করার জন্য গায়েবী মামলার অভাব নাই। পকেটে দুই হাজার পিছ ইয়াবা ও দেশীয় তৈরী বন্দুক পাওয়া গেছে উল্লেখ করে মিথ্যা জব্দতালিকা প্রস্তুত করে মিথ্যা অস্ত্র আইনের ও মাদকদ্রব্য আইনে মামলা করা পুলিশের জন্য অতি সহজ।

আপনার মত একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীর দখল থেকে ইয়াবা, অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তা কি বিশ্বাসযোগ্য হবে? আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হলে আমাকে জামিন দেবেন। জামিন পাওয়ার আগেই অনেক দিন হাজতবাস করে ফেলতে হবে। নিজের জন্য, পরিবারের সদস্যদের জন্য অসম্মানজনক, বিব্রতকর। দেশ কি মগের মুল্লুক হয়ে গেছে বলার পর তিনি আমাকে তিনজন আইনজীবীর নাম উল্লেখ করে স্মরণ করিয়ে দেন তারা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন হাজতবাস করার পর জামিন পেয়েছেন। এখনও জামিনে আছেন। আপনারা আইনজীবী সমিতির সিনিয়ার আইনজীবীরা একযোগে দাঁড়িয়ে বলায় আদালত জামিনে মুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু ৪/৫টা গায়েবী মামলার অভিযোগপত্রে তাদের অন্তর্ভূক্ত করায় এখনও প্রতি ধার্য তারিখে আসামী হিসেবে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। অবশ্য এটা সত্য যে সিনিয়ার পুলিশ কর্মকর্তাগুলির আদেশ দিয়ে নরহত্যা করিয়ে নিরীহ মানুষকে আসামী করিয়েছিলেন সে পুলিশ অফিসার প্রমোশন নিয়ে চট্টগ্রাম গিয়ে নিজের স্ত্রীকে হত্যা করিয়েছেন মর্মে অভিযুক্ত হয়ে চাকুরী থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এটাকে বলে আল্লাহর বিচার। এটাই সান্তনা।

আইনজীবীরা আইন ভঙ্গ করলে, অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে, বার কাউন্সিল আইনে বিচারের ও শাস্তির ব্যবস্থা আছে। এখনতো পুুলিশ গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ছাড়া বাড়ীতে গিয়ে তিনজন আইনজীবীকেই পরিবারের সদস্যদের সামনে গ্রেপ্তার করে হাতকড়া লাগিয়ে থানায় এনে কোর্টে চালান দেন। তাই সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার রক্ষা ও বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের হাত থেকে বাঁচার জন্য আইনজীবী সুরক্ষা আইন তৈরী করা সময়ের দাবী।

কিছু কিছু গুরুতর অপরাধের বিচারের ভার আইন রাষ্ট্রকে নিয়েছে। সেই সব গুরুতর অপরাধের মামলা সংক্ষুব্ধ প্রাইভেট বাদী বা সংবাদদাতা এজাহার বা অভিযোগ দায়ের করলেও আইনানুগভাবে মামলার বাদী হবেন রাষ্ট্র। সংবাদদাতা বা ব্যক্তি বাদী হবেন মামলার একজন সাক্ষী মাত্র। যেমন মেজর (অবঃ) সিনহা হত্যা মামলাটি আদালতে বাদী হিসেবে দায়ের করেছেন সংক্ষুব্ধ বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌসী এবং আসামী লিয়াকত আলী গং। মামলাটি আদালতের আদেশে এজাহার হিসাবে রুজু হওয়ার সাথে সাথেই রাষ্ট্র বাদী মামলা হয়ে গেছে। মামলার টেইটেলে লেখা হবে রাষ্ট্র বনাম লিয়াকত আলী গং। আদালতের নির্দেশেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব। তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তাই মামলার রাজা। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কোনভাবেই ডিসটার্ব করা বা তদন্তকার্যে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। মামলাটি রাষ্ট্র পক্ষে আদালতে পরিচালনা করবেন একজন পাবলিক প্রসিকিউটার। ক্ষেত্র বিশেষে পাবলিক প্রসিকিউটারের নিয়ন্ত্রনাধীনে একজন এ,পি,পি বা পুুলিশ কর্তাও মামলা পরিচালনা করতে পারবেন।

মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় মেজর (অবঃ) সিনহা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো তিনজন আসামীকে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে রিমার্ন্ডে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাবের পক্ষে, আবার পুলিশের পক্ষে দরখাস্ত করা হয়েছে আসামীদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার জন্য। মামলার সাক্ষী শিপ্রার কক্ষ থেকে অতি বিলম্বে জব্দ দেখানো ২৯ ডিভাইস/আলামত তদন্তকারীর নিকট হস্তান্তর করার পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য আদালতে দরখাস্ত করেছেন র‌্যাব। আবার পুলিশও নাকি দরখাস্ত করেছেন সিআইডিকে দিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করানোর জন্য আলামতগুলি তাদের জিম্মায় রাখার জন্য। অবশ্য আদালত আইনসম্মতভাবেই পুলিশের অবৈধ আবেদন নামঞ্জুর করে র‌্যাবের আবেদনই মঞ্জুর করেছেন। সরকারের দুইটি সংস্থার পক্ষে একই বিষয়ে আদালতে পরস্পর বিরোধী আবেদন করা অপ্রত্যাশিত, আইনতঃ অপ্রয়োজনীয়, সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিভ্রান্তিকর। একই ঘটনাস্থল থেকে একই সময় উদ্ধার করা আলামত একটি জব্দ তালিকা মূলেই জব্দ করা আইনতঃ উচিত ছিল। ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৩(৩) ধারার বিধান অনুযায়ী শিপ্রার কক্ষ থেকে জব্দ করা উপস্থিত সাক্ষীদের স্বাক্ষর করা মালামালের তালিকার একটি কপি স্বীকৃত মালিক হিসেবে শিপ্রাকে দেওয়া উচিত ছিল । এ ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধান লংঘন করা হয়েছে প্রতীয়মান হওয়ায় বিজ্ঞ ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতকে ন্যায় বিচার করতে হলে অবশ্যই নিরপেক্ষ,স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রপক্ষ আসামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করার জন্য আদালতে সাক্ষী হাজির করে হলফপূর্বক সাক্ষ্য গ্রহন করবেন এবং আসামীর পক্ষে সাক্ষীদের সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই/পরীক্ষা করার জন্য সাক্ষীকে জেরা করতে পারবেন। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সাক্ষীর চরিত্র সম্পর্কেও জেরা করতে পারবেন। তবে সাক্ষীকে বিব্রতকর, অসম্মানজনক, কুৎসামূলক জেরা করা যাবে না। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার আগে থেকে সাক্ষীকে জনসমক্ষে হেয় করার জন্য সাক্ষীর সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা আগাম প্রশ্নবিদ্ধ করার ও আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসতে নিরুৎসাহীত করার কুমানসে মিথ্যা, কুৎসামূলক, চরিত্রহননমূলক প্রচারণা চালানো আইনতঃ যাবে না।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় উল্লেখ আছে, কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা স¤প্রচার করেন যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন বা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এই ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তা হলে তার এই কার্য হবে একটি অপরাধ। কোন ব্যক্তি এই অপরাধ করলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর কারাদন্ডে অন্যুন সাত বৎসর অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

মেজর (অবঃ) সিনহা হত্যা মামলার সাক্ষী শিপ্রা দুইজন এসপিসহ শতাধিক পুলিশ সদস্যকে আসামী করে কক্সবাজার থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে এজাহার দায়ের করতে গেলে ঘটনাস্থল রামু থানাধীন অজুহাতে এজাহার গ্রহন করেন নাই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এজাহার গ্রহন করা না হলেও মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ায় আম-জনতা জানতে পারেন যে পুলিশ সুপারের মত দায়িত্বশীল ও সিনিয়ার পদে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা (কক্সবাজারের পুলিশ সুপার নন) গুরুতর শাস্তির বিধান আছে জানা সত্তে¡ও মারাত্মক ঝুকি কেন নিলেন তা ভেবে শান্তিপ্রিয় জনগণের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিরীহ আম-জনতা বলাবলি করছেন আইনজীবী ও সাক্ষীদের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরী করা ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে একান্ত জরুরী ও সময়ের দাবী। পুলিশের মহা পরিদর্শক যখন ঘোষণা করেন যে কারো ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব নেবে না। পুলিশ সুপার ও ইন্সপেক্টর পদ মর্যাদার অফিসারদের উল্লেখিত অবৈধ কার্যাবলী কি পুলিশ প্রধানের ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বাংলাদেশের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রাখা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের কাজে পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশের প্রতি ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার প্রতিফলন দেখতে চান দেশবাসী।

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি