মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » টার্গেট নির্বাচন কোন্দল নিরসনের তাগিদ আ’লীগে



টার্গেট নির্বাচন কোন্দল নিরসনের তাগিদ আ’লীগে


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
10.09.2021

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জেলা-উপজেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলনের মাধ্যমে দল গোছানোর পাশাপাশি দ্রুত অভ্যন্তরীণ বিবাদ নিরসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সেইসঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজ শুরু করার উদ্যোগও নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সাংগঠনিক বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জরুরি দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধামন্ত্রী।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকের শুরুতে শোক প্রস্তাব আনা হয়। এরপর সাত সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে আহমদ হোসেন সিলেটের, বি এম মোজাম্মেল হক খুলনার, এস এম কামাল হোসেন রাজশাহীর, মির্জা আজম ঢাকার, আফজাল হোসেন বরিশালের, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ময়মনসিংহের ও সাখাওয়াত হোসেন শফিক রংপুরের বিভাগীয় প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বৈঠকে না থাকায় চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ।

এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরা হয়। বিরাজমান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো সাংগঠনিক কাঠামোতে গৃহদাহ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী নেতাদের নাম তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব-বিবাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপিদের নেতিবাচক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

ইশতেহার প্রণয়নের কাজ শুরুর তাগিদ :আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে দলের ইশতেহার ও অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বৈঠক শেষে গণভবনের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, দলের বিভিন্ন বিভাগ, যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি উপকমিটিগুলোর সেমিনারের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনের ইশতেহারে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো আপডেট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রুমির কান্না, স্বপন সাময়িক বহিস্কার :সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার রোষানলে পড়ে বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হওয়ার চিত্র বৈঠকে তুলে ধরেছেন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সফুরা বেগম রুমি। এ সময় তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। রুমি বৈঠকে জানান, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে লালমনিরহাট সদর উপজেলার সম্মেলন হচ্ছে না। এ অবস্থায় সম্মেলন আয়োজনের
জন্য তাকে আহ্বায়ক করে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করা হয়েছে। কিন্তু লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা স্বপন তাকে নানাভাবে হেনস্থা করেছেন। পরে গোলাম মোস্তফাকে দল থেকে সাময়িক বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

‘আওয়ামী লীগার হতে হবে’ :বৈঠকে সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মাদারীপুরের নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত। এ নিয়ে নানামুখী অপ্রিয় ঘটনাও ঘটছে। ২৭ বছর ধরে রাজৈর উপজেলার সম্মেলন হচ্ছে না। তিনি এসবের নিষ্পত্তি চান। এ সময় প্রথমে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান ও পরে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বক্তব্য দেন। এই দুই নেতা মাদারীপুরে বিরাজমান ঘটনার জন্য পরস্পরকে অভিযুক্ত করেন। বেশ খোলামেলা কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিলেমিশে সাংগঠনিক কাজ করার তাগিদ দেন। তিনি শাজাহান খানের উদ্দেশে বলেন, আওয়ামী লীগার হতে হবে।
বৈঠকে মির্জা আজম জানান, মাদারীপুর জেলা কমিটি কিছুদিন আগে ডাসার উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দিলেও পাল্টা কমিটি করা হয়েছে। এ নিয়ে মারমুখী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি পাল্টা কমিটি গঠনের সঙ্গে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ রয়েছেন বলে জানান। অভিযোগ অস্বীকার করেন আবদুস সোবহান গোলাপ।

প্রসঙ্গ নোয়াখালী :বেশ কয়েক মাস ধরে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগে সাংগঠনিক জটিলতা চলছে। এ প্রসঙ্গ নিয়ে কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। তবে দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, নোয়াখালী আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-কোন্দল বিষয়ে বৈঠকে কোনো কথা হয়নি। তবে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন সংশ্নিষ্ট নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধানের একটা কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। দলের সভাপতিকে এটি অবহিত করা হয়েছে। আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি ফিরে আসার পর ওই কাঠামো প্রকাশ করা হবে।

ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই ও বসুরহাট পৌরসভার চেয়ারম্যান আবদুল কাদের মির্জা সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে বলেছেন, ‘ওবায়দুল কাদের নেত্রীর কাছে অব্যাহতি চেয়েছেন।’ এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

এমপির আশকারা ও ইউপি নির্বাচন :এ বছর অনুষ্ঠেয় প্রায় চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে দলের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কয়েকজন নেতা বলেছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই এ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে বেশ তোড়জোড় চলছে। এ ক্ষেত্রে দলীয় এমপিদের অনেকেই প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থীকে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার বেলায় আশকারা দিচ্ছেন। এতে দলের ভেতরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।
মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ :বৈঠকে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, বিভিন্ন নির্বাচনে বিদ্রোহ করার অপরাধে অনেকেই সাংগঠনিক শাস্তি পাচ্ছেন। কিন্তু ওই বিদ্রোহী প্রার্থীরা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু যারা তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী হতে উৎসাহ যুগিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দলীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ওই সাংগঠনিক সম্পাদক এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে কারও নাম না বললেও তিনি কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপির দিকে ইঙ্গিত করেন বলে কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন।

পদ হারাচ্ছেন শিমুল :নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল দলের পদ হারাচ্ছেন। গতকালের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিমুলকে একটি পদেই থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে তিনি নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ হারাবেন। তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমা পেলেন ১৭ নেতা :পাবনা জেলার সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনার পর বিদ্রোহী নেতাদের ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দলীয় প্রধানের কাছে চিঠি লিখে ক্ষমা চাওয়ায় মাফ পেয়েছেন পাবনা সদর ও পৌর আওয়ামী লীগের ১৭ নেতা। তারা পাবনায় পৌরসভা নির্বাচন বিদ্রোহ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবে এ প্রসঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন, বিভিন্ন জায়গায় যারা দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ করছেন তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।

তৃণমূল সম্মেলনের দিনক্ষণ হয়নি :বৈঠকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো জেলা কিংবা উপজেলা সম্মেলনের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেছেন, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আগে হবে। এরপর এই জেলার আওতাধীন মেয়াদোত্তীর্ণ উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডের সম্মেলন হবে। রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেছেন, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে নাটোর ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নভেম্বরে এ দুই জেলায় সম্মেলন হবে।

বিশেষ কাউন্সিল :আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে কয়েক দিন ধরে দলের বিশেষ কাউন্সিল নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা চলছে। গত বুধবার কয়েকজন নেতা বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার আভাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষতক এ নিয়ে বৈঠকে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা হয়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে দলের জাতীয় সম্মেলন প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।

পাল্টা জবাব দেওয়ার নির্দেশ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির অপপ্রচারের পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি সব সময়ই অপপ্রচারে অভ্যস্ত। নির্বাচন আরও ঘনিয়ে এলে তাদের অপপ্রচার আরও বাড়বে। তাদের এই অপপ্রচারের পাল্টা জবাব দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য নেতাকর্মীদের গণমুখী চরিত্র গঠনের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্রও বাড়তে থাকবে। সুতরাং সতর্ক থাকতে হবে। যে কোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

পরবর্তী নির্বাচনই মূল ফোকাস :সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বৈঠকের মূল ফোকাস ছিল পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়। এ জন্য যেখানে যেখানে যে যে সমাধান করা দরকার এবং কিছু কিছু ছোটখাটো কলহ-বিবাদ দ্রুত মীমাংসা করার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন সভাপতি শেখ হাসিনা।
দুই জেলার সম্মেলনের তারিখ :দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন জানান, বৈঠক শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্নিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আগামী ৬ নভেম্বর পাবনা এবং ৭ নভেম্বর নাটোর জেলার সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি