মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১



মেজর জিয়ার যত কুকীর্তি


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
10.09.2021

জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং জাতীয় চার নেতার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি সেনা বাহিনীর উপপ্রধান হয়ে হত্যাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, জেনেছেন যে, দেশের রাষ্ট্রপতিকে হত্যার চেষ্টা চলছে, তিনি তাদেরকে অভয় দিয়ে বলেছেন, এগিয়ে যেতে। অথচ রাষ্ট্রপতিকে তথা দেশকে বাঁচানোর শপথ করেছিলেন প্রজাতন্ত্রের চাকর হিসেবে। তিনি সেটিতো পালন করেনইনি, উল্টো এতোগুলো মানুষকে হত্যার কথা জানতে পেরে একজন মানুষ হিসেবেও তাদেরকে বাঁচানোর তাগিদ অনুভব করেননি।

এরপর ক্ষমতায় বসে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করেছেন যাদের প্রথম কাতারে রয়েছেন কর্নেল তাহের। বিএনপি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দায় নেবে না ভালো কথা, কিন্তু একবারও কি কর্নেল তাহের হত্যার জন্য তার পরিবার ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছে? চায়নি। অথচ কর্নেল তাহের না থাকলে জিয়াউর রহমানের ইতিহাস শেষ হয়ে যেতো ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরেই। কত মানুষ, কতো পরিবার গত ৪১ বছর ধরে কাঁদছে মির্জা সাহেব? হিসেব নিশ্চয়ই আপনার রাখার কথা নয়!! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে ধরে এনে নির্যাতনের ইতিহাস মির্জা সাহেব ভুলে যেতে পারেন কিন্তু এমন অনেক মানুষ আছে সেই নির্যাতনের চিহ্ন এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন, সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়েছেন, এমন মানুষের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে, যিনি জিয়াউর রহমানের নির্যাতনের শিকার।

মেজর জিয়ার যত কুকীর্তি

*১৯৭৫- এর ২৮শে অক্টোবরে সেনা প্রধানকে পদচ্যুত করে উপসেনাপ্রধান থেকে সেনাপ্রধান।
*বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র ৪ মাস পর ৭৫’এর ৩১শে ডিসেম্বর ৭২’এর ঘাতক দালাল আইন বাতিল করে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীর মুক্তি, যাদের মধ্যে ৭৫২ জন দণ্ডপ্রাপ্ত।
*জেল ও বঙ্গবন্ধু হত্যার সকল তদন্ত বন্ধ করে দেয়া।
*১৯৭৬- এর ২৯শে নভেম্বরে প্রধান সামরিক শাসন সায়েমের বিরোদ্ধে ক্যু করে প্রধান সামরিক শাসক
*১৯৭৭- এর ২১শে এপ্রিলে আবার সায়েমকে সম্পুর্ণ কিক আউট করে রাষ্ট্রপ্রধান
*১৯৭৭ এ অবৈধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিকরাজনীতির অনুমতি।
*১৯৭৭- এর ২২ এপ্রিল ১৯৭২ এর শাসনন্ত্রে ৩৮ অনুচ্ছেদের র্মূলপরিবর্তন এনে সংবিধানে সন্ত্রাস
*১৯৭৭ ৭ মে তে খুনিদের ক’জনকে পদোন্নতি এবং পূর্নবহাল
*১৯৭৭ এর হ্যাঁ না ভোট
*১৯৭৮- এর ৫ই এপ্রিলে ৫ম সংশোধন করে ১৯৭১-এর ঘাতক দালালদের নাগরিকত্ব দানের জন্য মন্ত্রনালয়কে আদেশ
*১৯৭৯- এর ৫ই এপ্রিল ৫ম সংশোধনীকে আইনে প্রণীত করে জেল ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দ্বাররুদ্ধ করতে বিষাক্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইন
*নতুন নাগরিকত্ব আইনের আওতায় পাকিস্তানের পাসপোর্ট হাতে রাজাকার গোলাম আজমকে দেশে প্রবেশের অনুমতি
*আব্বাসকে ৭৯তে জামাতের আমীর হতে দিয়ে দেশে মৌলবাদ এবং জামাতের স্বাধীনতা বিরোধী সকল কার্যকালাপকে সাংবিধানিক বৈধতা
*১৯৭২ এর সাংবিধানকে কেটে ছিড়ে নিজের ইচ্ছে মত সব কিছু জায়েজ করার নগ্ন প্রচেষ্টা
বেগম খালেদা জিয়া ও তার কুপুত্র তারেক জিয়া নূতন কুতর্ক উস্কে দিয়ে বলেছেন, তার পিতা “বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন।” মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করবার এবংবিধ প্রচেষ্টা স্বাধীন বাংলাদেশে নূতন নয়। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার কুকর্মটি দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি নেতৃবৃন্দ চালিয়ে আসছেন। আগে চলেছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। এখন সেটি চলছে দলটির অর্বাচীন নেতৃবৃন্দ কর্তৃক বিভিন্ন সেমিনারে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির এসব হীন প্রচেষ্টা অনৈতিক-অসাংবিধানিক এবং সেহেতু দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হওয়া জরুরী।

যে বা যারা এই ঐতিহাসিক বৈধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তথা সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বলেন তারা শুধু ইতিহাস বিকৃত করেন না, সংবিধান লঙ্ঘন করেন। আদতে “স্বাধীনতার ঘোষক”, “স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট” এসব বলার আসল উদ্দেশ্য হলো কোনো না কোনো ভাবে জিয়াউর রহমানের নামটি আলোচনার টেবিলে সচল রাখা। তাতে ইতিহাস, সংবিধান লঙ্ঘিত হলেও ক্ষতি নাই। কিন্তু কেন এই নীচ এবং হীন প্রচেষ্টা? আসলে খতিয়ে দেখা দরকার কে এই মেজর জিয়া?

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন এবং যুদ্ধ শেষে পাক সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পদক “হিলাল-ই-জুরাত” পদক জোটে তার ভাগ্যে। সূত্রঃ- উইকিপিডিয়া ও পাক ডিফেন্স ফোরাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত জিয়াউর রহমান অখ্যাত কোন মেজর ছিলেন না। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনুগত এবং প্রচণ্ড রকম ভারতবিদ্বেষী ও মুজিববিদ্বেষী ছিলেন। তার প্রমাণ তিনি রেখেছেন প্রতি পদে পদে।

জিয়াউর রহমান ১৯৬৮-৬৯-এ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্যদের মামলা”য় পাকিস্তান সামরিক সরকারের কৌশুলি কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমানের সহকারী ছিলেন। কথিত আছে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সামরিক সরকারের পক্ষে কথা আদায়ে এই দু’জন বঙ্গবন্ধুকে জেরা ও নির্যাতন করেন। সূত্রঃ- জেনারেল জিয়ার রাজনীতি, আবীর আহাদ।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ “স্বাধীনতার ঘোষণা” বেতারে সম্প্রচারের জন্য যখন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উদ্যোক্তাগণ জ্যেষ্ঠ বাঙালী সামরিক কর্মকর্তার খোঁজ করছিলেন তখন বাঙালী নিধনে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের দায়িত্ব পালনে প্রেরিত হয়েছিলেন মেজর জিয়া। কনিষ্ঠ বাঙালী সামরিক কর্মকর্তারা তাকে পথ থেকে ধরে এনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে হাজির করেছিলেন। সূত্রঃ- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহাম্মদ।

বাঙালী জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের চূড়ান্ত এক সন্ধিক্ষণে ঘটনাচক্রে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতার ঘোষক। প্রথমবার স্বাধীনতার ঘোষণায় নিজকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের চাপের মুখে তা প্রত্যাহার করে পরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও অধীনে উল্লেখ পালন করেন। এটি ছিল পরিষ্কার অসততা এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা মাত্র।

মেজর জিয়ার কুকীর্তির কিছু কথা সংযোজিত হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর ধারাক্রম পূর্ণতা পাবে। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ রাত ১১-৩০ মিনিটে ঢাকায় “অপারেশন সার্চলাইট” অনুযায়ী পাকবাহিনী কর্তৃক পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যা শুরু হলে চট্ট্রগ্রাম সেনানিবাসের সিগন্যাল কোরের বাঙালী সৈনিকরা সে খবর ১ম জানতে পায় এবং তারা একত্রে সমবেত হয়ে সদলবলে রাত ১২-৩০ মিনিটে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বাঙালী সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ১,৮০০ জন।

এসময় তারা খবর পায় সেনানিবাসের ঊর্ধ্বতন বাঙালী অফিসার ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে পাকবাহিনী ইতোমধ্যে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। এ সংবাদে বাঙালী সৈনিকরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং পাক সৈনিকদের বন্দী অথবা কোনরকম বাধা পেলে হত্যার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তখন রাত ১টা থেকে ১-৩০ মিনিটে ২য় ইস্ট বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার লে. ক. জানজুয়া তার অধস্তন টুআইসি মেজর জিয়াকে যে কোনো কৌশলে বাঙালী সৈনিকদের বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দেন।

বসের নির্দেশনানুযায়ী পাক আর্মি ইন্টেলিজেন্সের বিশ্বস্ত ও চৌকষ কর্মকর্তা মেজর জিয়া বাঙালী সৈনিকদের উদ্দেশ করে তাৎক্ষণিক এক আবেগময় বক্তৃতায় তার অধীনস্ত সৈনিকদের অস্ত্র সমর্পণের অনুরোধ জানান এবং বলেন, বিদ্রোহ করবার প্রয়োজন হলে তা আমার নেতৃত্বেই হবে এবং জীবন দেওয়ার প্রয়োজন হলে সর্বপ্রথম আমিই জীবন দেবো। সুতরাং, আপনারা অবিলম্বে অস্ত্র সমর্পণ করে বিশ্রামে যান। বাঙালী সৈনিকরা তাদের ঊর্ধ্বতন বাঙালী এই অফিসারের আবেগপ্রবণ কথায় বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করে অস্ত্র সংবরণ করে এবং ঘুমাতে যায়।

রাত ২ থেকে আড়াইটার দিকে নিরস্ত্র, ঘুমন্ত ১,৮০০ বাঙালী সৈনিকের উপর মাত্র ৫০০ বালুচ্ ও পাঞ্জাবী সৈন্যেরা অতর্কিতে আক্রমণ চালায়্ এবং সর্বমোট ১,২০০’র অধিক সৈনিক, তাদের পরিবার ও শিশুদের চরম নির্মমতায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। সুতরাং ২৫শে মার্চ গণহত্যার রাত থেকেই তথাকথিত ঘোষক মেজর জিয়ার হস্ত ছিল বাঙালীর রক্তে রঞ্জিত! নিহত সেইসব সৈনিকদের স্মরণে দীর্ঘকাল চট্টগ্রাম সেনানিবাসে কোন স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী হয় নি। এখন হয়েছে কিনা জানা নাই।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কোন পর্যায়েই তাঁদের নামও অন্তর্ভূক্ত হয় নি। কারণ এ ঘটনা প্রকাশিত হলে মেজর জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতার স্বরূপ উন্মোচিত হবে বলে তা সুপরিকল্পিতভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়। সূত্রঃ- ১. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম); ২. সেনাপতির মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই এবং ৩. মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে মেজর জিয়ার পলায়ন, সিরু বাঙালী।

২০১৯ সালের ১২ এপ্রিল জাতির পিতার হত্যাকারী ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। তবে এর আগে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করে গেছেন তিনি।

জবানবন্দিতে মাজেদ জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিদের সবাই বঙ্গভবনে আশ্রয় নেয়। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের পাশের ভিআইপি স্যুটে (দ্বিতীয় তলা) তারা অবস্থান করতেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতেন। নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের পুরষ্কার হিসেবে খুনিদের একটি করে পদোন্নতি এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে চাকরি দেওয়া হয়। তবে এর আগে থেকেই খুনিরা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করতেন। তাদের সব চাহিদা পূরণে দেখভাল করতেন খোদ জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের পরোক্ষ সমর্থন ছিল উল্লেখ করে মাজেদ বলেছেন, আগের রাতে হত্যাযজ্ঞ শেষে পরদিন ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান সকাল ১০টা-১১টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট অডিটোরিয়ামে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সব জওয়ান ও অফিসারকে অ্যাড্রেস করেন। ওইখানে উনি (জিয়াউর রহমান) মটিভেট করেন যে, যে ঘটনা গত রাতে ঘটে গেছে তোমরা সেসব নিয়ে কোনওরকম মাথা ঘামাবে না। তোমরা সব চেইন অব কমান্ডে ফিরে যাও। সবাই কাজকর্ম কর। এটা জাতির ব্যাপার, এটা আমাদের ব্যাপার নয়।

জিয়াউর রহমানের বিষয়ে মাজেদ বলেছেন, তখন বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সিপাহীও ক্যু’র বিষয়ে জানতো না। তাদের তো কোনও অফিসারও তাতে জড়িত ছিল না। তবে ওই বেঙ্গল রেজিমেন্টের দু’-তিনজন রিটায়ার্ড অফিসার ছিল। আর বাকিরা ট্যাংক রেজিমেন্ট, আর্মড কোরের লোক। তিনি (জিয়াউর রহমান) বক্তৃতা দিয়েছেন, মটিভেট করেছেন। সমর্থন না থাকলে আগ বাড়িয়ে উনি করতে যাবেন কেন? রেগুলার ওরাই ডিক্টেক্ট করত সবকিছু। হুকুম চালাত ওইখান থেকে। ওরা যা চাইত তাই উনি করে দিতেন।

মাজেদ বলেছেন, উনি (জিয়াউর রহমান) বঙ্গভবনে খুনিদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন এবং খুনিরাও তার সঙ্গে ওইখান থেকে যোগাযোগ করতেন ডাইরেক্ট এবং আর্মির চেইন অব কমান্ড বলতে কিছু ছিল না। ওরাই চালাত প্র্যাকটিকালি। ওইখান থেকে। মাঝখানে সেনা হেডকোয়ার্টারে একবার আমি ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে উনাকে (জিয়াউর রহমান) আমার জন্য একটি সিভিল সার্ভিসের ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলাম। ইন্ট্যারভিউতে তিনি (জিয়াউর রহমান) প্র্যাকটিকালি এই ক্যু’র ব্যাপারে পক্ষপাতসূলভ কথাবার্তা বলছেন। বুঝা গেছে, ক্যু’র সমর্থকদের সঙ্গে উনার (জিয়াউর রহমান) সব ধরনের যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীতে যখন বিদেশে যাওয়ার প্রশ্ন এল তখন তিনি (জিয়াউর রহমান) দফায় দফায় বঙ্গভবনে মিলিটারি সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন। এইগুলো আমরা দূরে থেকে দেখেছি।

পরে (জিয়াউর রহমান) বললেন, এখানে (বঙ্গভবনে) যে সমস্ত অফিসার আছে তারা সবাই বিদেশে যাবে। তাদের কাগজপত্র তৈরি করার জন্য তৎকালীন মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশহুর হককে নির্দেশ দেন। ওই সময় আমি বঙ্গভবনে স্কট ডিউটিতে ছিলাম। পরবর্তীতে আমাদের ব্যাংককে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পরই জিয়াউর রহমান সাহেব পুরো ক্ষমতা নিয়ে নেন। কিছুদিন পর আমাদের লিবিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আমরা শুনলাম রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নেতৃত্বে কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে। রিসালদার বলছিল, তার সঙ্গে দু’জন সিপাহীও ছিল। সিপাহীরা তো ওইখানে যাওয়ার কথা নয়।

জবানবন্দিতে মাজেদ উল্লেখ করেছে, লিবিয়ায় যাওয়ার পরে বলা হল সবার ফরেইন সার্ভিস হবে। জিয়াউর রহমান ফরেইন সার্ভিস দেবেন সবাইকে প্রাইজ হিসেবে। একটা করে প্রমোশনও দিয়ে দেবেন। কিছুদিন পরে (আমার এক্সাট ডেট মনে নাই) জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে জেনারেল নুরুল ইসলামকে (শিশু) আমাদের কাছে পাঠানো হয়। কার কার কোথায় ফরেইন পোস্টিং হবে সেই চয়েজ নিতেই তিনি গেছেন ওইখানে।

ফরেন সার্ভিসে যাদের চাকরি দেয়া হয়েছিল, তাদের সেই যোগ্যতাই ছিল না জানিয়ে মাজেদ বলেছেন, উনার (জিয়াউর রহমান) সরাসরি পৃষ্ঠপোষকাতার কারণেই তাদের একটা করে প্রমোশন জাম্পড এবং একটা করে ফরেইন প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই অফিসারেরা ফরেইন সার্ভিসের জন্য কোয়ালিফাইড ছিলেন না, এমনকি গ্রাজুয়েটও ছিলেন না। তাদের বেশিরভাগই স্বল্প মেয়াদী কমিশনড অফিসার ছিলেন।

তাদের (ক্যু’ অফিসারের পরিবার) বঙ্গভবন থেকেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল লিবিয়াতে। অনেকে বিয়ে না করেও তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে চলে গেছে। মেজর শাহরিয়ার এক ভদ্রলোকের স্ত্রীকে নিয়ে চলে যায়। মেজর হুদা নারায়ণগঞ্জের এক মেয়েকে বিয়ে না করেই নিয়ে যায়। পরে এসব কাজের বৈধ কাগজপত্র তৈরি করে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।

খুনিদের বঙ্গভবনে অবস্থানের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তার বিষয়ে মাজেদ বলেছেন, আমরা শুনেছি যে উনি (শহীদ খালেদ মোশাররফ) বলেছেন ওই মেজররা শুধু শুধু বঙ্গভবনে বসে থাকবে কেন? তারা চলে আসবে। ইউনিটে চলে আসবে। তারা কমান্ডে ফিরে আসবে। ওইটা তার (খালেদ মোশাররফের) একটা ন্যায্য দাবি। সঠিক দাবি, চেইন অব কমান্ড। চেইন অব কমান্ড ছাড়া ফোর্স চলে নাকি? তবে শহীদ খালেদ মোশাররফকে যারা শহীদ করছে তাদের পিছনেও ক্যু’ পার্টির সমর্থন ছিল। জিয়াউর রহমান এলে ডাইরেক্ট লিফ্ট দিয়ে দোতলায় উঠে (ভিআইপি সুইট) যেতেন। সেখানেই তাদের কথোপকথন হত।

হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করা ওই স্বীকারোক্তিতে মাজেদ উল্লেখ করেছেন, অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে তিনিও খুনিদের সঙ্গে ছিলেন। এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেন। রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্য সদস্যদের একে একে গুলি করে হত্যা করেন। পরদিন স্টেশন সদর দফতরে গিয়ে স্টেশন কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করে ইউনিটে যোগ দিতে চাইলেও তৎকালীন কমান্ডার কর্নেল হামিদ তাকে যোগদান করতে না দিয়ে বেতার ভবনে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

ইতিহাসের গর্হিত এই হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বারবার আড়াল করার চেষ্টা করে গেছেন মাজেদ। তবে খুনিদের দেওয়া সব ধরনের সুবিধা ভোগ করে গেছেন। সেনেগালেরর রাষ্ট্রদূত করার বিষয়টি তার পছন্দ হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে মাজেদের ইচ্ছানুযায়ী দেশে ফিরিয়ে এনে উপ-সচিব পদমর্যাদায় বিআইডব্লিউটিসিতে পদায়ন করা হয়। সবশেষ যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ে পরিচালক করা হয় তাকে।

 



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি