বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সভা, আলোচনায় কোন্দল ও জোটের রাজনীতি



বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সভা, আলোচনায় কোন্দল ও জোটের রাজনীতি


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
13.09.2021

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্তে কেন্দ্রীয় নেতাদের ধারাবাহিক সভা ডেকেছে বিএনপি। গুলশান কার্যালয়ে আগামীকাল (মঙ্গলবার) শুরু হবে এ সভা। চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। সভা থেকে আগামী দিনের করণীয় চূড়ান্তে নেওয়া হবে নেতাদের মত। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গেও বৈঠক করবে বিএনপি। সবার মত নিয়ে চূড়ান্ত করা হবে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা। শনিবার অনুষ্ঠেয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পরপর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা করার বিধান রয়েছে। তবে চেয়ারপারসন মনে করলে যে কোনো মুহূর্তেই এ সভা ডাকতে পারেন। সবশেষ চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলায় রায় ঘোষণার আগে ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা হয়। ২০১৬ সালে জাতীয় কাউন্সিলের পর জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণার প্রায় দুই বছর পর হয় প্রথম নির্বাহী কমিটির ওই বৈঠক। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান খালেদা জিয়া। বর্তমানে সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্ত তিনি। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়ে নির্বাহী কমিটির কোনো সভা ডাকা হয়নি। আড়াই বছরের বেশি সময় পর নির্বাহী কমিটির সভার আদলেই কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে হাইকমান্ড।

জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নির্বাহী কমিটির সভা রাজধানীর কোনো হোটেল বা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে করার বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ নেতা বলেন, সরকার তাতে অনুমতি দেবে না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়রানি করতে পারে। তাই একদিনে না করে কয়েকদিন ধরে এ সভা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ই নিরাপদ। পরে এ সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে বৈঠকের দিনক্ষণ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসএমএসের মাধ্যমেও তাদের অবহিত করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দলের হাইকমান্ড তিন দিনব্যাপী ধারাবাহিক সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা নেতাদের সভার দিনক্ষণ জানিয়ে দিয়েছি। প্রতিদিন বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে এ সভা হবে। প্রতি বৈঠকে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে সভাপতিত্ব করবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা থাকবেন। তিনি বলেন, প্রথম দিন মঙ্গলবার জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টারা, বুধবার নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহসম্পাদক এবং শেষদিন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেবেন। তবে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সভায় ডাকা হয়নি। তাদের নিয়ে শিগগিরই বৈঠক করবেন তারেক রহমান।

প্রিন্স বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা কারণেই এ সভা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকে অনেকে মত দেবেন। এছাড়া আমাদের মূল এজেন্ডা থাকবে নিরপেক্ষ সরকার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন আদায়ে আন্দোলন। সেই আন্দোলন কীভাবে কার্যকর রূপ নিতে পারে সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিএনপি নীতিনির্ধারকরা বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ফের শুরু হয়েছে কর্মকাণ্ড। ক্ষমতাসীন দল তাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে কার্যনির্বাহী কমিটির সভা করেছেন। ভবিষ্যৎ আন্দোলন ও নির্বাচনী কৌশল চূড়ান্তে বিএনপিও এ সভার আয়োজন করছে।

সূত্র জানায়, এ বৈঠকটি আরও কিছুদিন পর হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তারা নানাভাবে সন্দেহ শুরু করছে। নির্বাচন নিয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও তাদের কাছে খবর রয়েছে। তাই বিএনপিও যাতে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে পারে সেজন্যই জরুরি এ সভা। দলের একাধিক নেতা জানান, সভায় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ মত দিতে পারেন। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া, নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলনের প্রস্তুতি ও করণীয় নিয়ে তারা মত দেবেন। দলের বেশির ভাগ নেতা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর জোর দেবেন। যে কোনো মূল্যে দলীয় কমিশন গঠন করা হলে, তা প্রতিহত করা হবে। তারা মনে করেন, এ দুটি দাবি সরকার সহজে মেনে নেবে না। তাই দাবি আদায়ে আন্দোলনের বিকল্প নেই। কিন্তু সেই আন্দোলন যাতে একটা যৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছানো যায় সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট মত দেওয়া হবে।

জানা গেছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টিও সভায় আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে করণীয় প্রসঙ্গে নেতারা মত দেবেন। এসব জোট রেখে বৃহত্তর ঐক্য নাকি এদের বাদ দিয়ে বৃহত্তর ঐক্য হবে সে বিষয়টিও উঠবে আলোচনায়। তবে দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, জোটের চেয়ে এই মুহূর্তে দলীয় শক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত। তাই কীভাবে দলকে শক্তিশালী করা যায় তা নিয়েই বেশির ভাগ নেতা মত দিতে পারেন। সভায় দলের পুনর্গঠন নিয়ে বড় করে আলোচনায় আসবে। দেড় বছর ধরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় দল গোছানো সম্ভব হয়নি। তাই আগামী দিনের আন্দোলনের আগে দলকে শক্তিশালী করার ওপর সবাই জোর দেবেন। কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট নানা অভিযোগের বিষয়টিও কেউ কেউ সভায় তুলতে পারেন। তৃণমূলের মতামতের ওপর ভিত্তি করে দল পুনর্গঠন করা উচিত বলে মত দেবেন অনেকে। পুনর্গঠন কেন্দ্র করে সারা দেশে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে হাইকমান্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপ চাইবেন কেউ কেউ। জাতীয় কাউন্সিল করার পক্ষেও আসতে পারে মত। জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখনো স্থায়ী জামিন পাননি। তার মুক্তি প্রসঙ্গে দলের ভূমিকা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। এ ব্যাপারে দলের করণীয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট মতও দেবেন অনেকে। দলের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কসহ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের বিষয়টিও উঠবে আলোচনায়।

দ্রুত দল পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত : করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দল পুনর্গঠন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশে নেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।

প্রত্যাহার হচ্ছে ছাত্রদলের সাবেক ১২ নেতার বহিষ্কার : অবশেষে প্রত্যাহার হচ্ছে ছাত্রদলের সাবেক ১২ নেতার বহিষ্কার। শনিবার জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। ছাত্রদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ২০১৯ সালের ২২ জুন তাদের বহিষ্কার করা হয়। ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে কেন্দ্র করে কিন্তু হঠাৎ করে বয়সের সীমা নির্ধারণ করায় এর প্রতিবাদ জানান একটি অংশ। ছাত্রদলের সাবেক নেতা এজমল হোসেন পাইলটের নেতৃত্বে তারা আন্দোলন করেন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়। ১২ জনকে বহিষ্কার করা হয়।

দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করা হচ্ছে -বিএনপির স্থায়ী কমিটি : দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করা হচ্ছে বলে মনে করছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। সভা মনে করে, ‘উপহারের ঘর যারা ভেঙেছে তাদের তালিকা হাতে রয়েছে’- প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্য আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ঘর নির্মাণে দুর্নীতিবাজ আওয়ামী লীগ দলীয় ঠিকাদার ও দলবাজ আমলাদের দুর্নীতি ও পক্ষে সাফাই গাওয়ার শামিল। প্রকৃত পক্ষে দুর্নীতিকে এখন রাষ্ট্রীয় ভাবে সমর্থন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে স্থায়ী কমিটি। শনিবার স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভার এ সিদ্ধান্ত রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

এতে আরও বলা হয়, সভায় চট্টগ্রাম পুরাতন সার্কিট হাউজে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে থাকা জাদুঘর সরিয়ে ফেলা হবে বলে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী যে উক্তি করেছেন তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। জাদুঘর সরানোর হীন সিদ্ধান্ত কোনো দিনই জনগণ মেনে নেবে না।

৪ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক শাহিবর রহমানকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানানো হয়। সভায় সম্প্রতি ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিসহ দলের বহুসংখ্যক নেতাকর্মী এবং অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও তাদের অবিলম্বে মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি