বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১



দুর্নীতির বরপুত্র যখন দেশনায়ক!


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
14.09.2021

আমরা সকাল-সন্ধ্যা রাজনীতিবিদদের নিয়ে নিন্দায় মুখর থাকলেও, এই আমরাই রাজনীতিবিদদের নিষ্পাপ হওয়ার সনদ দিয়ে থাকি। আমাদের রাজনৈতিক সমর্থন মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। একাংশ সব সময় ক্ষমতাসীনদের প্রতি অসন্তুষ্ট, একাংশ ‘আই হেইট পলিটিক্স’-এ বিশ্বাসী এবং অবশিষ্টাংশ নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থক। এই অবশিষ্টাংশ ‘সব দল সমান’, ‘কেউ ভালো নয়’- এ জাতীয় নিরপেক্ষ মন্তব্য করলেও চূড়ান্তভাবে কোনো না কোনো দলের পক্ষেই অবস্থান নেয়। ফলে দলীয় কোনো নেতার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাক না কেন, সমর্থকদের কাছে ব্যাখ্যা দাঁড়ায়- জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে নিষ্পাপ-নিরপরাধ নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাই সার্বিকভাবে দেশের জনগণের উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে রাজনীতি সচেতন বলা গেলেও, তাদের বোধহয় দেশ সম্পর্কে সচেতন বলা যাবে না।

উপরের কথাগুলো বলার উপলক্ষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক বলে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালান। অবশ্য কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকেই কেউ কেউ রাজনৈতিক বলে অভিহিত করেছিলেন, সেখানে তারেক রহমানের বিচারকে রাজনৈতিক বলায় আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু যে প্রশ্নটি বারবার জাগে তা হচ্ছে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যতগুলো অভিযোগ রয়েছে তার কতটি অভিযোগ, কতটি প্রমাণ উপেক্ষা করা সম্ভব? জানতে ইচ্ছে করে, বিএনপির কোনো নেতা বা সমর্থক কি হলফ করে বলতে পারবেন- সব অভিযোগ মিথ্যা? আর অভিযোগ মিথ্যা না হলে তারেক রহমান কি আইনের ঊর্ধ্বে? তারেকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ রয়েছে তার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে দেশের জনগণের, বিশেষত নতুন প্রজন্মের জানা একান্ত প্রয়োজন। জিয়ার ভাঙা ব্রিফকেস ও সততার গল্প বলে যে ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয় তার প্রকৃত চিত্র অবশ্যই জানা উচিত। দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য হলেও এ প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তারেক রহমানের ব্যবসায়িক জীবনের শুরু ১৯৯১ সালে। এরশাদ প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আয়ের বৈধ কোনো উৎস জানা না গেলেও বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারেক প্রথম আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছিলেন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। অজ্ঞাত ১২ জন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত টাকাকে উৎস হিসেবে দেখিয়ে পূর্ববর্তী দুটি অর্থ বছরের (১৯৮৯, ৯০) আয়কর রিটার্ন দাখিল করে ৪৩ লাখ টাকা হোয়াইট মানি হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত নৌপরিবহনের দুটি ব্যবসা ছাড়া আরো অন্তত ছয়টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তবে ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে আয় দেখানো হয়। এই আয়ের উৎস কি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারেকের ব্যবসার অংশীদার ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। ১৯৯৪ সালে মামুনের ছদ্মনামে শিল্প ঋণ সংস্থার প্রতিষ্ঠিত ১৬ কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণ করা তাজ ডিস্টিলারিজ ক্রয় করেন নামমাত্র মূল্যে। এভাবে শুরু হয় তারেকের ব্যবসায়িক জীবন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ করে এত টাকার মালিক হওয়ার কারণে তারেক রহমানকে কোনো আইনি জটিলতায় পড়তে হয়নি। তাই রাজনৈতিকভাবে হয়রানি যদি উদ্দেশ্য হতো তাহলে সে সময়ই তারেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হতো।

অনিয়ম ও সুনির্দিষ্ট উৎসবহিভর্‚ত আয় থাকলেও ২০০১ সাল পর্যন্ত তারেক রহমানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সীমায় সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০১-এর নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের একক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয় হাওয়া ভবন। তারেক, মামুন, খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ ইস্কান্দার ও শামীম ইস্কান্দারসহ গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কাছে যেনতেনভাবে টাকা উপার্জনই হয়ে ওঠে মুখ্য। রহমান শিপার্স থেকে ক্রমে প্রতিষ্ঠা হতে থাকে রহমান গ্রুপ, ওয়ান গ্রুপ, রহমান নেভিগেশন, চ্যানেল ওয়ান, ডান্ডি ডায়িং, খাম্বা লিমিটেড, এডভান্স এড, আর কে গ্রুপ, টিএম এন্টারপ্রাইজ, ইউনিটেক্স এ্যাপারেলস, ক্রিমেন্টাইন লিমিটেড, ক্রোনোটেক্স লিমিটেড, তুরাগ ফিশারিজ, তাজ ডিস্টিলারিজ, দৈনিক দিনকালসহ নানা প্রতিষ্ঠান।

জিয়া পরিবার কতটি খাত থেকে মোট কত টাকা গ্রহণ করেছিল এবং কোথায় সম্পদ গড়েছেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার উপায় নেই। উদাহরণস্বরূপ তাজ ডিস্টিলারিজ ক্রয় করা হয়েছিল আবদুল্লাহ আল মামুন নামে। এতে তৎকালীন সময়ের হিসাবে সরকারের ক্ষতি হয় অন্তত ১১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি কোম্পানির বিপরীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ নেয়া হয়েছিল বিপুল অঙ্কের টাকার। তখন একাউন্ট হোল্ডারদের পরিচয় চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই বেনামে যে অর্থ উপার্জন করা হয়েছে তার হিসাব পাওয়া যায়নি। আবার নির্বাচনে মনোনয়ন ও বিভিন্ন লাভজনক পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হতো, যার হিসাব পাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া যেসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয়েছিল তাদের সবাই মুখ খোলেননি। জানা যায়, হাওয়া ভবনের একজন কর্মচারীও তৎকালীন সময়ে কোটিপতি বনে গিয়েছিল। অতএব তারেক রহমানের দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। কিন্তু তারপরও আর্থিক যেসব তথ্য প্রমাণ ও পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তাতে উপলব্ধি করা যায় কেন বাংলাদেশ পর পর পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের এমন কোনো খাত ছিল না যেখানে তারেক রহমান হস্তক্ষেপ করেননি। হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক ছায়া সরকার ছিল রাষ্ট্রের পাওয়ার হাউস আর এখান থেকে সবকিছুর বিকিকিনি চলেছে টাকার হিসাবে। স্ত্রী, কন্যা, শাশুড়ি এবং বন্ধুদের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ার পর অবৈধ উপায়ে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য আড়াল করে শুরু হয় অর্থপাচার ও বিদেশে সম্পদ ক্রয়ের পালা। অনুসন্ধানে দেখা যায় ২০০২ সাল থেকে তারেক রহমানের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শুরু হয়। জিয়া পরিবার অর্থ পাচার ও পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের জন্য সিঙ্গাপুরে দুটি কনসোর্টিয়াম গঠন করেছিল। একটি থাইল্যান্ড কেন্দ্রিক তারেক রহমানের মালিকানাধীন কনসোর্টিয়াম যার অন্যতম সদস্য ছিল থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। এ পরিবারের অপর কনসোর্টিয়ামের নাম তঅঝত (জাফিয়া, আরাফাত, শর্মিলা, জাহিয়ার নামানুসারে) কনসোর্টিয়াম। আরাফাত রহমান কোকোর মালিকানাধীন এ কনসোর্টিয়াম ২৪টি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল, যার একটি দাউদ ইব্রাহিমের ডি কোম্পানি। এই অর্থপাচার এতটাই সন্দেহজনক ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং পর্যবেক্ষক সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন প্রশাসন।

এফবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে যে, তারেক ও মামুন তাদের সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নির্মাণ কন্সট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক এবং চীনের হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশনের এ দেশীয় এজেন্ট খাদিজা ইসলামের কাছ থেকে সাড়ে ৭ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের মাধ্যমে তারেক রহমানের ১২ কোটি টাকা দেশে ফেরত আনা সক্ষম হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের সিটিএনএ ব্যাংকে পাচারকৃত ২১ কোটি টাকার মধ্যে ৮ কোটি টাকা দেশে ফেরত আনা হয়। একইভাবে লন্ডনের Nat West ব্যাংকে প্রায় ছয় কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে।

বেলজিয়ামে তারেকের সম্পত্তির পরিমাণ ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়ায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং দুবাইতে রয়েছে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি (বাড়ির ঠিকানা : স্প্রিং ১৪, ভিলা : ১২, এমিরেটস হিলস, দুবাই)। সৌদি আরবে মার্কেটসহ অন্যান্য সম্পত্তির কিছু বিবরণ পাওয়া যায় প্যারাডাইস পেপারসে। প্যারাডাইস পেপারের সূত্রে জানা যায়, তারেক জিয়া ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে কেইম্যান আইসল্যান্ড এবং বারমুডায় ২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। প্যারাডাইস পেপার কেলেঙ্কারিতে তারেক রহমান ছাড়াও তার স্ত্রী জোবায়দা রহমান, বেগম জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী এবং বেগম জিয়ার প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের নাম উঠে এসেছে।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিদেশে টাকা পাচারসহ অভিযোগের পাহাড় রয়েছে। এখানে আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়নি জঙ্গিবাদে পৃষ্ঠপোষকতা, দেশকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করার অপচেষ্টা, শত শত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে মদদদান, কণ্ঠরোধ ও দলীয় কর্মীদের দ্বারা বিরোধী মত দমনের জন্য নির্লজ্জভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার পরিসংখ্যান। এখানে তুলে ধরা হয়নি ব্যক্তিস্বার্থে দেশের প্রতিটি খাতকে ধ্বংস করে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার বিবরণ। শুধু জিয়া পরিবারের পাঁচ বছরের দুর্নীতির উপাখ্যান লিখলে তা মহাকাব্য হয়ে যাবে। আমাদের সচেতন নাগরিকদের বিবেচনা করা উচিত এতসব তথ্যপ্রমাণ থাকার পরও তারেক রহমানের মতো একজন চিহ্নিত ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ কীভাবে দেশের দ্বিতীয় দলের শীর্ষ পদে আসীন থাকেন! ভেবে দেখা উচিত কোন বিবেচনায় এবং কোন মানসিকতার মানুষদের কাছে তারেক রহমান দেশনায়ক হিসেবে বিবেচিত হন। দেশের অগ্রযাত্রাকে উল্টোপথে ধাবিত করে ও জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের নায়করা যদি দেশনায়ক বলে গণ্য হয় তাহলে অন্ধকার ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি