বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১



কালিমালিপ্ত জিয়া


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
15.09.2021

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনীতি ও সেনাবাহিনীতে নানা অঘটন এবং চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতায় থাকাকালীন জিয়াউর রহমানের শাসনকালে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতিতে পাকিস্তানি ধারা চালু হয়। জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যেগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করেছে। এরকমই একটি দিন ৩ জুন ১৯৭৮ সাল। গণতন্ত্রের হন্তারক ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার জনক জিয়া ওইদিন সেনাপ্রধানের পদে থেকে নাটকীয় এক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন।

১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। প্রায় ৪০ দিন পর জুনের ৩ তারিখে নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐ বছরের ১ মার্চ থেকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সেদিন জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) সহ ৬টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট প্রার্থী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ৫টি দলের সমন্বয়ে গঠিত গণ ঐক্য জোটের প্রার্থী জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী।

‘শুধু সামরিক আইনে নয়, দেশের সংবিধান অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য চাকরিরত অবস্থায় নির্বাচন তো দূরের কথা অন্য কোনো সংগঠনেও সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। জিয়াউর রহমানের মতো অন্যায়কারীর তখন কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে, নির্বাচনের নামে প্রহসন করেছে।’

এরপর তথাকথিত সেই নির্বাচন শেষে নিজেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। জিয়াউর রহমানের সামরিক উর্দি ও অস্ত্রের ভয়ে দেশের গণমাধ্যম অনিয়মের বিষয়ে চুপ থাকলেও, বিদেশি গণমাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচারিত হয়। এই নির্বাচনে জিয়া কোনো কোনো এলাকায় ১১০ ভাগ ভোট পেয়েছেন বলেও প্রমাণসহ বিভিন্ন বিদেশি সংবাদপত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেসময় নির্বাচন কাভার করতে আসা নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক উইলিয়াম বর্ডার ১৯৭৮ সালের ৪ জুন প্রকাশিত রিপোর্টে প্রচুর জাল ভোট আর প্রতিপক্ষ এজেন্টদের নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার কথা লেখেন। এই নির্বাচনে গণ ঐক্য জোটের ৪০ জন কর্মী নিহত হয়। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা করে ২০০টির অধিক কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্ট আর নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের বের করে দেয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সামরিক গবেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার, পিএসসি-এর মতে, ‘জিয়াউর রহমান এদেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিল। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের মতো বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্রের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে প্রহসন করে গেছেন। পৃথিবীর কোনো দেশেই গণতন্ত্রের আগে বা পরে কোনো উপসর্গ বা অনুসর্গ ব্যবহার করা হয়নি। গণতন্ত্র মানেই গণতন্ত্র। সেখানে নিজের স্বার্থ এবং ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্যই জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার পরও নির্বাচন করেছিলেন।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘শুধু সামরিক আইনে নয়, দেশের সংবিধান অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য চাকরিরত অবস্থায় নির্বাচন তো দূরের কথা অন্য কোনো সংগঠনেও সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। জিয়াউর রহমানের মতো অন্যায়কারীর তখন কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে, নির্বাচনের নামে প্রহসন করেছে।’

জিয়ার পেশাগত জীবনে ঘটেছে নানান উলম্ফন। ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান মূলত ছিলেন একজন মেজর। ১৯৭৫ সালের মধ্যেই তিনি মেজর জেনারেল এবং উপ-সেনাপ্রধানের পদ পেলেন। কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মদদ দিলেন। দখল করলেন সেনাপ্রধানের পদ। এরপর প্রহসনের বিচারে হত্যা করলেন শত শত মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্যকে। এমনকি যে কর্নেল তাহের তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, তাঁকেও হত্যা করলেন। মার্শাল ল অর্ডিন্যান্স জারি করে দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। বন্দি করেন রাজনীতিবিদদের। একপর্যায়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্রের মুখে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। নষ্ট করে দেন নির্বাচনি ব্যবস্থা।

তার হাতে খুন হয়ে যায় বাংলার মানুষের ভোটের অধিকার। দেশ থেকে হারিয়ে যায় গণতন্ত্র। একারণে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করতে খুনতন্ত্র কায়েম করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁর মতে, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ান ও অফিসারদের হত্যা করে খুনতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। দিনের পর দিন কারফিউ দিয়ে দেশে কারফিউতন্ত্র কায়েম করেছিলেন, তবু নিজে রক্ষা পাননি। আর এ দেশে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে ষড়যন্ত্রের নীলনকশাই বাস্তবায়ন করে গেছেন।’

স্বৈরাচার জিয়াউর রহমান প্রথমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এরপর নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে ধ্বংস করে দিয়েছেন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। হ্যাঁ-না ভোট নামের একটি তামাশার প্রচলন ঘটিয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করে, ভোটারবিহীন ভোটের প্রবর্তকও তিনি। জিয়াউর রহমানের অবৈধ ক্ষমতার মোহের কারণেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থাপনায় পতিত হয় বাংলাদেশ। ফলে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় রাজনীতিতে ফিরে আসার নীতির কারণে ধর্মভিত্তিক দলগুলো সুযোগ পায়। এর ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।

জিয়াউর রহমান শুধু বাংলাদেশের গণতন্ত্রকেই খুন করেননি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন তিনি। জিয়াউর রহমানের হস্তক্ষেপে লিবিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় পায় জাতির পিতার খুনিদের একটা বড় অংশ। এসময় লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানসহ অন্যান্য খুনিদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করেন তিনি। এমনকি তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধুর খুনিরা জনশক্তি রফতানির কোম্পানি খোলে এবং বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় লোক পাঠানোর ব্যবসা করে। এছাড়াও কন্সট্রাকশান কোম্পানির ব্যবসা করে অনেক টাকার মালিক হয় তারা এই সময়ে। এমনকি তাদের সমর্থকদের লিবিয়ায় নিয়ে, অস্ত্র চালনার অত্যাধুনিক ট্রেনিং দিয়ে, দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাও করে এই খুনি চক্র। জিয়াউর রহমান নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এদের শতভাগ পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন।

ভোটারবিহীন নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের শতভাগ ভোটের বিজয় এবং স্বৈরাচারী শাসন চালুর ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি প্রচলনের জন্য, জাতির কাছে জিয়াউর রহমান মীরজাফরের সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি, খালেদা জিয়াও জনগণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এক ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজন করেন। কোনো দল ওই সাজানো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায়, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে জিতিয়ে আনেন বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ফ্রিডম পার্টির আবদুর রশিদকে।

জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি সম্পর্কে পাকিস্তানের দি হেরাল্ড পত্রিকায় বলা হয়, ‘বিএনপির জন্ম ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার নীলনকশার ফলে।… এই দলের জন্য যে দর্শন নির্ধারণ করা হয় তা হলো: আওয়ামী লীগের দুর্বল স্থানে আঘাত করা এবং জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব জাগ্রত করা।… নিন্দিত আওয়ামী লীগার, চরম বামপন্থী ও মুসলিম লীগারদের নিয়ে দলের জনবল বাড়ানো হয়।’এর আগে, ১৯৭৭ সালে এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে ক্ষমতাচ্যুত করে, অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এরপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে একটি হ্যাঁ-না ভোটের আয়োজন করেন তিনি।

১৯৭৭ সালের লোক দেখানো সেই ভোটের আগে, বিক্ষোভের ভয়ে, রাস্তায় কোনো মানুষকে পর্যন্ত বের হতে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো প্রচারণাও করা হয়নি। ভোটের দুদিন আগে সড়কের পাশের দেয়ালে, চলমান রিকশা-বাস ও মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে জোড় করে জেনারেল জিয়ার সামরিক পোশাক পরিহিত পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ানো হয় মানুষের মধ্যে। ভোটের দিন ভয়ে কেউ বের হওয়ার সাহস পায়নি। ফলে ভোটারবিহীন থেকে যায় ভোটকেন্দ্রগুলো। এক পর্যায়ে মানুষ খুঁজে না পেয়ে, শেষ পর্যন্ত স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীকে ভোট দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। দিন শেষে ঘোষণা আসে, ৯৯.৪ ভাগ ভোট পেয়ে একচেটিয়াভাবে জয় লাভ করেছেন জেনারেল জিয়া।

মূলত ১৯৭৮ সালের ৩ জুন কলঙ্কের কারণ ইতিহাসে এমন নির্বাচনের ঘটনা নজিরবিহীন । যেকোনো মূল্যে, যেকোনোভাবে ক্ষমতাকে হালাল করার জন্য জিয়াউর রহমান প্রহসনের নির্বাচন করেছিলেন। গণতন্ত্রের মূল্যবোধের কোনো কাঠামোর সাথেই সেই নির্বাচন সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।৩ জুন একারণে গণতন্ত্র হত্যা দিবস।

লেখক : কবি, কলামিস্ট



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি