বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » লুই আই কানের মূল নকশায় ফিরছে সংসদ ভবন, সরছে জিয়ার কবর



লুই আই কানের মূল নকশায় ফিরছে সংসদ ভবন, সরছে জিয়ার কবর


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
15.09.2021

সংসদ ভবন কমপ্লেক্স এলাকা লুই আই কানের মূল নকশায় ফিরিয়ে আনতে শিগগিরই কাজ শুরু হচ্ছে। এক্ষেত্রে নকশা বহির্ভূত স্থাপনা অন্যত্র স্থানান্তর বা ভেঙে ফেলা হবে। পাশাপাশি মূল নকশায় থাকলেও এখনও নির্মিত হয়নি এমন স্থাপনাগুলোও নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। জানা গেছে,যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা লুই আই কানের নকশা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে,নকশার বাইরে নির্মিত বৃহৎ স্থাপনাগুলো সরানো হবে কিনা সেই বিষয়ে সরকারের অবস্থান এখনও স্পষ্ট হয়নি। জানা গেছে,স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারসহ কয়েকটি বড় স্থাপনা নকশার বাইরে নির্মিত হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসালভেনিয়া ইউনির্ভাসিটির আর্কাইভ থেকে পাঠানো জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশা বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এটি বর্তমানে সংসদ সচিবালয়ের হেফাজতে রয়েছে। সংসদ সচিবালয় কমপ্লেক্সে নকশা বহির্ভূত নির্মিত সকল ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদ করে মূল নকশায় ফিরিয়ে আনতেই সরকারের সিদ্ধান্তে এ নকশা আনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংসদের অধিবেশনে সংসদ ভবন কমপ্লেক্স’র নকশা পাওয়ার বিষয়টি এবং এক্ষেত্রে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বর্তমান সরকারের বিগত মেয়াদে সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর দাবি ও সংসদ ভবনের পূর্ব প্রান্ত থেকে মেট্রোরেলের রুট হওয়া খবরের প্রেক্ষাপটে লুই কানের মূল নকশার প্রসঙ্গটি উঠে আসে। মেট্রোরেলের রুটের বিরোধিতাকারীদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ওই সময় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নকশার বাইরে আরো কিছু স্থাপনা নির্মিত হওয়ার কথা জানান। এগুলো বিগত বিএনপি সরকার করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ওই সময় নকশা খতিয়ে দেখারও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সংসদ সচিবালয়ে খোঁজাখুজি করে তখন পূর্ণাঙ্গ নকশা পাওয়া যায়নি। পরে সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে লুই কানের মূল নকশা আনার উদ্যোগ নেয়।

মূল নকশা আনার প্রক্রিয়ার সময় ২০১৩ সালে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকেও নকশা বহির্ভূত একটি স্থাপনা করতে গেলে স্পিকারের নির্দেশে তা বন্ধ করা হয়। পরে ২০১৪ সালে সংসদ কমিশনের বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্মিতব্য ওই স্থাপনা বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি স্পষ্ট জানিয়ে দেন,সংসদ ভবন এলাকায় নকশা বর্হিভূত কোনও স্থাপনা রাখা যাবে না। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়,সংসদ ভবন এলাকার নকশা বর্হিভূত সকল স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এছাড়া সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংসদ ভবনের মূল নকশা আনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছরের ১৭ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় জিয়াউর রহমানের কবর চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। একই বছরের ৭ জুলাই একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন,সংসদ ভবনের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি লুই আই কানের নকশা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কবরগুলো যদি সরানোর দরকার হয়,তাহলে সরকার তা করবে।

এরপর এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করে ১৪ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে স্থপতি লুই আই কানের নকশায় শেরেবাংলা নগর এলাকায় কবরস্থানের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি উল্লেখ করে জিয়াউর রহমানের কবরসহ জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত সব ক’টি কবর সরানোর পক্ষে মত দেয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

এরই মধ্যে সংসদ সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের জন্য গত বছর ১৩ অক্টোবর তোলা হলে প্রধানমন্ত্রী তা ফেরত পাঠান। ওই সময় তিনি এও জানিয়ে দেন লুই কানের নকশা আসার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, লুই আই কানের মূল নকশার প্রথম ধাপ ছিল ২০৮ একর জায়গার ওপর জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ। যার সামনে ও পেছনে থাকবে বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ। চারদিকে আট লেনের সড়ক,মাঝখানে লেক। দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ। এছাড়া বাকি জায়গায় গড়ে তোলা হবে সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতালসহ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিকবলয়। জানা গেছে, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের আমলে বর্তমান সংসদ ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ওই সময় স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই লুই আই কান এই প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর লুই কান কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মূল নকশাসংশ্লিষ্ট কিছু পরিকল্পনা তিনি হস্তান্তর করতে পারেননি। পরবর্তীকালে এ নিয়ে কোনো সরকারই আগ্রহ দেখায়নি।

লুই কানের নকশা বহির্ভূতভাবে সংসদ ভবন এলাকার উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবর প্রতিস্থাপন,ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ করে অর্ধ চন্দ্রাকৃতির চন্দ্রিমা উদ্যানের আকৃতিও পরিবর্তন হয়। এর নামও পরিবর্তন করে জিয়া উদ্যান রাখা হয়। এছাড়া সংসদ ভবনের পশ্চিম দিকে আরো সাতটি কবর রয়েছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আটজন নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে পাঁচ বিঘা জমিতে ‘জাতীয় কবরস্থান’ নাম দিয়ে সাত জনকে সমাহিত করা হয়। তারা হলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার,সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান,সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দীন খান।

এ আটটি কবর ছাড়া শেরেবাংলা নগরে আছে লুই কানের নকশাবহির্ভূত আরও সাতটি স্থাপনা। এগুলোর মধ্যে বড় স্থাপনা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (বিআইসিসি) এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন। এর বাইরে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবরের চারদিকে থাকা চারটি প্রবেশপথের শুরু বা শেষ প্রান্তে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু, সম্মেলন কেন্দ্র ও মসজিদসহ চারটি স্থাপনা।

গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সংসদ এলাকায় মূল নকশার বাইরে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের জন্য বাসভবন বানানো হয়। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তখন ভবন দুটি তৈরি হয়। এ সংক্রান্ত একটি মামলা এখনও বিচারাধীন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রও বিএনপির আমলে তৈরি শুরু হয়। তখন এর নাম রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এর নাম পরিবর্তন করে।

এদিকে, নকশা বহির্ভূত কিছু স্থাপনা হলেও নকশায় ছিলো এমন অনেক স্থাপনা এখনো নির্মিত হয়নি। নকশা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ লাইব্রেরি,জাদুঘর ও প্রশাসনিক সচিবালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কথা রয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর বিষয়ে এর আগে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘জাতীয় সংসদ ভবনের সীমার ভেতরে নকশায় যা আছে, শুধু তাই থাকবে। মোদ্দা কথা সেখানে মূল নকশাই আমরা প্রতিস্থাপন করব। এটা করতে গিয়ে সেখানে কারও কবর থাকলে তাও অপসারণ করা হবে।’

নকশা প্রাপ্তি সাপেক্ষে এ বছরই মূল নকশা প্রতিস্থাপন করার কাজ শুরু হবে বলে ওই সময় তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, নকশায় যা আছে, তাই থাকবে। নকশার বাইরে যা কিছু আছে, সেগুলো থাকবে না।

এছাড়া সংসদের একাধিক অধিবেশনের প্রশ্নোত্তরে মন্ত্রী কবর সরানোয় সরকারের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘লুই আই কানের মূল নকশাতে আমরা ফিরে যাব। কারো কবরস্থান আমরা এখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাব না। আমরা শুধু লুই আই কানের নকশার যে অবস্থান আছে সেই অবস্থানে ফিরে যাব। লুই আই কানের স্থাপনাকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করবো।’

অবশ্য স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন বা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র সরানো হবে কি না এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই সময় মন্ত্রী স্পষ্ট করে কিছু জানাননি। ওই বিষয়ে জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন বলেন, মূল নকশা পাওয়ার পর সরকার এগুলো বিবেচনা করে দেখবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নকশা হাতে পেয়েছি। আগে আমরা এটা যাচাই-বাছাই করে দেখবো। তারপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো।’ তবে কবর বা অন্যান্য স্থাপনা কবে নাগাদ সরানো হতে পারে এ বিষয়ে তিনি টেলিফোনে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বলেন, ‘আমি নকশা আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। এটা বাংলাদেশে এসেছে এবং সংসদ সচিবালয়ের হেফাজতে রয়েছে। এখন কী পদক্ষেপ হবে বা কবে হবে সেটা সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু পূর্ণাঙ্গ নকশা পাওয়া গেছে সেই কারণে এখানে অস্পষ্টতার কিছু থাকবে না। তবে কান সম্পর্কে যারা ভালো জানেন বা তার সম্পর্কে পড়াশুনা রয়েছে এমন স্থপতিদের নিয়ে এটা আরো যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বড় স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে সহসা সিদ্ধান্ত না আসলেও কবরের মতো ছোট-ছোট স্থাপনাগুলো দ্রুতই সরিয়ে ফেলা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্থাপনাগুলো সরানোর জন্য সরকার এতদিন লুই আই কানের নকশার জন্য অপেক্ষা করেছিল। নকশাটা হাতে আসায় পদক্ষেপ গ্রহণে দেরি হওয়ার কথা নয়।’

নকশা আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংসদ সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ ওয়াই এম গোলাম কিবরিয়া বলেন,‘নকশাগুলো সংসদ সচিবালয়ের সম্পদ। এটা সংসদের হাতে এসেছে এটাই বড় কথা। কোনও স্থাপনা নির্মাণ বা ভেঙ্গে ফেলা সংসদ সচিবালয়ের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এটা সরকারের গণপূর্ত বিভাগের কাজ। তারা কবে করবে বা কীভাবে করবে সেটা তারাই বলতে পারবে।’



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি