রবিবার ৫ ডিসেম্বর ২০২১



বিলুপ্তির পথে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
02.10.2021

বিলুপ্তির পথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বহুল আলোচিত ‘২০ দলীয় জোট’ ও ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’। জোট দুটির ব্যানারে আর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হবে না। নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নতুন জোট গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি।

অভিন্ন দাবিতে সমমনা দলগুলোর রাজপথে ‘যুগপৎ আন্দোলনে’র মাধ্যমে এ জোট গঠন করা হবে। নতুন জোটের সম্ভাব্য নাম হচ্ছে ‘সম্মিলিত বিরোধীদলীয় জোট’।

সারাদেশে সাংগঠনিকভাবে মোটামুটি শক্তিশালী ও সক্রিয় ডান-বাম-ইসলামী দল এবং সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে এ জোট গড়ে তোলা হবে। অবশ্য এতে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য দলগুলোও থাকবে। তবে কৌশলে বাইরে রাখা হবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে। বিএনপি ও জোট দুটির নীতিনির্ধারক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, দেশ আজ গণতন্ত্রহীন। দেশের মানুষ মৌলিক মানবাধিকার বঞ্চিত। পরপর দুটি নির্বাচনে মানুষ ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়েছে। দেশে একনায়কতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছে আওয়ামী লীগ। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে আগামী দিনে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের শক্তিগুলোর সঙ্গে সে লক্ষ্যে যোগাযোগ হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা এখন দল পুনর্গঠন করছি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছি। দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠকে মাঠনেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতাদের মতামত নিচ্ছি। ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখনও বহাল আছে। দলের সর্বোচ্চ ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে জোটের বিষয় এবং পরবর্তী কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠকে ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়া, ‘ওয়ানম্যান শো’ দলগুলোকে জোটভুক্ত না করা এবং আগামীতে যুগপৎ কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথের অবস্থান থেকেই বিএনপির নেতৃত্বে বিভিন্ন দল ও মতের শক্তিকে এককাতারে ঐক্যবদ্ধ করে নতুন জোট গড়ে তোলার ওপর জোরালো মত দিয়েছেন মাঠপর্যায়ের নেতারা। বিএনপি হাইকমান্ড মাঠপর্যায়ের নেতাদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

দলটির উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ইতোমধ্যে ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে পড়েছে। তবে কৌশলগত কারণে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে জোট বিলুপ্তির ঘোষণা দিতে চায় না বিএনপি। আগামী দিনে দলের একক কর্মকৌশলের মাধ্যমেই তা প্রকাশ পাবে। জোটের শরিকরাও যার যার মতো করে নিজেদের অবস্থান বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একইভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও নির্বাচনের পর থেকে আড়াই বছর ধরে নিষ্ফ্ক্রিয়। তাই সফল আন্দোলনের স্বার্থে বিএনপি নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে।

আগামী ৮ অক্টোবর বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে মতবিনিময়ের পর দলের মাঠপর্যায়ের নেতা ও পেশাজীবীদের মতামতের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবে বিএনপি। পরে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মতামতগুলো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হবে।

চারদলীয় জোটের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল ১৮ দল এবং পরে পর্যায়ক্রমে আরও দুটি দল নিয়ে ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়। ডানপন্থি ও মধ্য-ডানপন্থি দলগুলোর সমন্বয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী এ জোট গড়ে উঠেছিল। অবশ্য যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এ জোট গড়া হয়েছিল, এ মুহূর্তে তা আর কার্যকর হবে না বলে মনে করছে বিএনপি। জোটের প্রতিটি শরিক দলই ভাঙনের মুখে পড়ে দুর্বল ও ক্ষয়িষুষ্ণ হয়ে পড়েছে। জোটে থেকেও কোনো কোনো শরিক দলের মূল নেতা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য-বিবৃতিও দিচ্ছেন; জোটের ভেতর উপজোটও গঠন করছেন। অনেক দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও একেবারে নেই বললেই চলে। জনগণের কাছেও গ্রহণযোগ্য দল ও নেতা হিসেবে ব্যর্থ তারা। বেশিরভাগই ‘ওয়ানম্যান শো পার্টি’।

দলীয় সূত্র জানায়, এ ধরনের দলগুলোকে নতুন জোট থেকে বাদ দিয়ে বাইরে থাকা ডান-বাম ও ইসলামী দলগুলোকে এককাতারে এনে নতুন জোট করতে চায় বিএনপি। এ জোটের মূল লক্ষ্য হবে প্রথমত, নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি আদায়; দ্বিতীয়ত, বর্তমান ‘অগণতান্ত্রিক’ সরকারের পতন; এবং তৃতীয়ত, সুষ্ঠু নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এলে সরকার গঠন।

এক্ষেত্রে জামায়াত নতুন জোটের পথে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে জামায়াত জোটের বাইরে থেকে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হতে পারবে।

এ ব্যাপারে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেন, গত দুই-আড়াই বছর ঐক্যফ্রন্টের কোনো বৈঠক হয়নি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। দেশে ভোটের অধিকার পুরোপুরি হরণ হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ জোটকেন্দ্রিক রাজনীতিও নির্ভর করছে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করার ওপর। বিএনপির মাঠনেতাদের বক্তব্য আন্দোলনের পক্ষে। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানের সঙ্গে তাদের বক্তব্যও মিলেছে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সবার ঐক্য জরুরি। এ দাবি আদায়ে নতুন এক মঞ্চেও আন্দোলন হতে পারে, আবার যুগপৎ আন্দোলনও হতে পারে।

বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা জানান, এ উপমহাদেশে রাজনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক জোট ‘অনস্বীকার্য’। সময়ের প্রয়োজনে নতুন জোট গঠন ও পুরোনো জোট বিলুপ্ত হতেই পারে। বহুদিন ধরে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট নিষ্ফ্ক্রিয় রয়েছে। এ নিষ্ফ্ক্রিয়তা জোটের নেতাকর্মীরাও মেনে নিয়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে আন্দোলনে গ্রহণযোগ্য দেশপ্রেমিক সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে এককাতারে আনা সময়ের দাবি। নতুন জোট গঠনের মাধ্যমে লুপ্ত হবে পুরোনো জোট দুটি। জামায়াতকেন্দ্রিক বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতেই এ কৌশল গ্রহণ করছে বিএনপি। এরই মধ্যে বাম ফ্রন্টসহ প্রগতিশীল অন্যান্য দলের কর্মসূচিতেও এর সামঞ্জস্যতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া সব দলই বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করেছে।

বিএনপি নেতারা আশা করেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ইতিবাচক ভাবমূর্তির সব দল-মতকে সম্পৃক্ত করার পথে জামায়াত নিজ থেকে সুযোগ করে দেবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা গণফোরামের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সমকালকে বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল এখন নিষ্ফ্ক্রিয়। অবশেষে দেড় বছর পর বিএনপির কুম্ভকর্ণ ঘুম ভেঙেছে; দলীয় নেতা ও পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছে। তিনি বিএনপির শুভকামনা করে বলেন, এখন নয়, জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরে মূল্যায়ন করা যাবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, মাঠনেতা ও পেশাজীবীদের মতামতগুলো পর্যালোচনার পর নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের ইস্যুতে কর্মসূচি দেবে বিএনপি। এরই মধ্যে বিএনপি সমমনা বাম-ডান-ইসলামী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। তারাও পৃথক মঞ্চ থেকে একই ইস্যুতে যুগপৎ কর্মসূচি দেবে।

২০ দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও নিজ নিজ অবস্থান থেকে পৃথক কর্মসূচি দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে জোটগতভাবে কোনো কর্মসূচি দেবে না বিএনপি। দলটি এককভাবে দলীয় ব্যানারে কর্মসূচি পালন করবে। সব দলের পৃথক কর্মসূচি যুগপৎ কর্মসূচির রূপ পাবে।

এ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা মন্তব্য করতে রাজি নন। বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পর তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

অবশ্য ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির একাংশের মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম গতকাল বলেন, এ মুহূর্তে সব গণতান্ত্রিক দল ও শক্তি জোটভুক্ত হয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসতে চায়। ২০ দলীয় জোটের সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। জোটে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা এনে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাকে জোট থেকে অব্যাহতির দাবি করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন নেতা জানান, রাজপথের কর্মসূচিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী অবস্থান- তা দেখে বিভিন্ন দলকে নতুন রাজনৈতিক জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে পুরোনো ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আপনাআপনিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এরই মধ্যে নতুন জোটের সম্ভাব্য নাম ঠিক করা হয়েছে ‘সম্মিলিত বিরোধীদলীয় জোট’।
দ্বিতীয় একটি নামও আলোচনায় রয়েছে; সেটি হচ্ছে- ‘সম্মিলিত বিরোধীদলীয় ঐক্যফ্রন্ট’। তবে প্রথম নাম চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছেন নেতারা। তাদের মতে, কার নেতৃত্বে আন্দোলন ও সরকার গঠন হবে, তা ঠিক করার সময় এখনও আসেনি। সময়মতো তা স্পষ্ট হবে।

২০ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো হচ্ছে- বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, ইসলামী ঐক্যজোট, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, কল্যাণ পার্টি, ন্যাপ, মুসলিম লীগ-বিএমএল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এডিপি, লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, ডেমোক্রটিক লীগ, পিপলস লীগ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), সাম্যবাদী দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশ ও জাতীয় দল। বিএনপি ছাড়া এ জোটের প্রায় প্রতিটি দলই ভাঙনের মুখে পড়েছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলো হচ্ছে- বিএনপি, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ। এগুলোর মধ্যে গণফোরাম ও জেএসডি ভাঙনের মুখে পড়েছে। ড. কামালের নেতৃত্বে গণফোরামের ঐক্য অটুট রাখার জোর চেষ্টাও কাজে আসছে না।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি