শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১



জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারছে না বিএনপি


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
10.10.2021

নিউজ ডেস্ক: নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনের কৌশল চূড়ান্তে ব্যস্ত বিএনপি। নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সেই আন্দোলনে পাশে চায় দলটি। বিশেষ করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ ইস্যুতে বসবেন তারা।

ইতোমধ্যে দলটির বিভিন্ন স্তরের কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেছে হাইকমান্ড। আর গণআন্দোলন ছাড়া দাবি আদায় করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু রাজপথের সেই আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারবে কিনা-তা নিয়ে দলের ভেতর ও বাইরে চলছে আলোচনা। এ নিয়ে বেশ চিন্তিত বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও।

তাদের মতে, আন্দোলন নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সারা দেশে নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে আন্দোলনে আসেনি চূড়ান্ত সফলতা। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এবারও দাবি আদায় করা সম্ভব হবে না। তাই সব শ্রেণি-পেশা ও সাধারণ মানুষকে আস্থায় আনাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখছেন তারা।

নীতিনির্ধারকরা আরও জানান, অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবারের আন্দোলনে দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সবাইকে সম্পৃক্ত করতে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। রাজপথে নামার আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হবে। এ ইস্যুতে সভা-সেমিনারসহ বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি সরকারের নানা ব্যর্থতা তুলে ধরে তৈরি করা হবে পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন। যা পৌঁছে দেওয়া হবে সারা দেশের আনাচে-কানাচে। বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষ যাতে আস্থা আনতে পারে সেজন্য দেশের বিভিন্ন পেশার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের কাজে লাগানোর চিন্তাও করা হচ্ছে। জনগণের মৌলিক দাবিতেই বিএনপি রাজপথে নামছে-তাদের মাধ্যমে দেওয়া হবে এমন বার্তা।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, নির্যাতন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা ব্যর্থতায় মানুষ বিএনপিকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছে। তারা মনে করছে বিএনপিই একমাত্র বিকল্প। তাই সারা দেশের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরাও এবার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ সরকারের পতনে রাজপথে আছি এবং থাকব।

আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা জাতীয় স্বার্থ নিয়েই আন্দোলন করে থাকি। এ আন্দোলনে অবশ্যই জনগণের সমর্থন এবং তাদের সম্পৃক্ততাও রয়েছে। কিন্তু গুলি, হামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে জনগণকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়। জনগণ যাতে সেই ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আন্দোলনে শরিক হন আমরা সেদিকেই গুরুত্ব দিচ্ছি।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশে যে সংকট চলছে সেটা বিএনপির একার নয়। গোটা জাতির সংকট। তাই এ সংকট নিরসনে বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশিষ্টজন, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

দলটির নেতারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ভোটাধিকার হরণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিভিন্ন খাতে সীমাহীন দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে এ সরকারের ওপর মানুষ ক্ষুব্ধ। মামলা কিংবা হয়রানির কারণে তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। তারা রাজপথে কারও নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে। মানুষের পুঞ্জীভূত এ ক্ষোভকে যারা কাজে লাগাতে পারবে তারাই হবে ভবিষ্যতের ‘হিরো’।

বিএনপি রাজপথে থেকে এর নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বিএনপি ডাক দিলেই সবাই চলে আসবে না। এজন্য শুরুতে জনগণকে আস্থায় আনতে হবে। দাবির পক্ষে যৌক্তিকতা ও বিএনপি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে কী করতে চায় সে বিষয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা জনগণের মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে দলের একটি উইংকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ক্ষমতায় গেলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না, সবার মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, সব জায়গায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের হাত থেকে রক্ষাসহ কয়েকটি বিষয়কে সামনে এনে একটি খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। যা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দলের নেতাকর্মীদের দিয়ে রাজপথে আন্দোলন করে সরকারকে বেকায়দা ফেলানো যাবে না। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে চাপে ফেলতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকার আগ্রহী হবে না। এমনকি দাবির প্রতি সরকার কর্ণপাতই করবে না। তাছাড়া আন্দোলনের কৌশল কী হবে সে বিষয়েও জনগণের মধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। স্পষ্ট করতে হবে জামায়াতের বিষয়ে দলের অবস্থান। ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি অনেকটা জামায়াত জোটে থাকা না থাকার ওপর নির্ভর করবে।

দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, অতীতের আন্দোলনের ব্যর্থতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। কেন আন্দোলন সফল হয়নি তার সঠিক কারণ নির্ণয় করা হচ্ছে। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে আন্দোলন করে সফলতা পাওয়া যায় না সেটা আজ প্রমাণিত।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেতাকর্মীরা রাজপথে ছিলেন। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। তাছাড়া তৃণমূলের মতো আন্দোলন ঢাকায় গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলনের প্রতি মৌন সমর্থন থাকলেও তারা প্রকাশ্যে রাজপথে নামেনি।

জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আগামী দিনে বিএনপি কি করতে চায় তা এখনই স্পস্ট করতে হবে। কারণ, তাদের অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষ এখনো দ্বিধায় রয়েছে। তাদের আন্দোলনে কেন মানুষ আস্থা রাখবে তা স্পষ্ট করতে হবে। জানান দিতে হবে বিএনপিই বিকল্প শক্তি। আন্দোলন বা নির্বাচনে যাওয়ার আগে জাতির সামনে কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ক্ষমতায় গেলে তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না-সবার আগে এ প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। মানুষ যাতে সেটা বিশ্বাস করে সেই আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। কারণ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া একটা সফল আন্দোলন সম্ভব নয়।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি