বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১



যে কলঙ্কিত নির্বাচনের স্মৃতি এখনও অম্লান


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
12.10.2021

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসে সবচেয়ে প্রহসন এবং কৌতুকী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনের স্মৃতি এখনও অম্লান হয়ে আছে। বর্তমানে বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচন কারচুপি এবং নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা করে তখন কেউ ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে আনে না। বরং বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ইতিহাসকে মুছে ফেলারও একটা প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ প্রত্যাশা করেছিল যে, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত হবে। তবে মাগুরা নির্বাচন এবং মিরপুর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি প্রমাণ করে যে ,তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে যেতে রাজি নয় বরং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখা, যেনতেন প্রকারে নির্বাচনে জয়লাভ করাই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য। আর এ বিকৃত মাগুরা এবং মিরপুর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন। এ দাবিতে এক পর্যায়ে তীব্র গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন এবং সংসদ অকার্যকর হয়ে যায়।

বেগম খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন যে, একমাত্র পাগল এবং ছাগল ছাড়া কেউই নিরপেক্ষ নয় এ ধরনের দাবি অবাস্তব। এমনকি বিএনপির নেতা প্রয়াত সাইফুর রহমান বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার মতো বোকামি আর পৃথিবীতে কিছু হতে পারে না। বিএনপির আরেক নেতা ব্যারিস্টার আব্দুল সালাম তালুকদার বলেছিলেন, এ ধরনের উদ্ভট প্রস্তাব কোনদিনই গণতান্ত্রিক রীতি সম্মত নয়। এরকম তীব্র বিরোধীদার পরও আওয়ামী লীগ সভাপতি পিছু হটেনি বরং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে একটি গণ-আন্দোলনের সূচনা করেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন, তিনি যেকোনো মূল্যে নির্বাচন করবেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ধার্য করা হয় জাতীয় সংসদের নির্বাচনের দিন। আওয়ামী লীগসহ প্রায় সব বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেন। এমনকি বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামও ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।

বিএনপি তখন নির্বাচন আয়োজন করার জন্য এক অদ্ভুত প্রহসনের পথ বেছে নেয়। তারা বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দল ফ্রিডম পার্টিকে নির্বাচনে নিয়ে আসে এবং দল সর্বস্ব হারা কিছু রাজনৈতিক দলকে দিয়ে এক প্রহসনের নির্বাচন করার চেষ্টা করে। কিন্তু তীব্র গণপ্রতিরোধের মুখে ২৩৪ টি আসনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং ১ শতাংশ মানুষও ভোট প্রদান করেনি। ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন ছিল সারা দেশ উত্তাল গণআন্দোলনের জোয়ারে। কোন মানুষই এ নির্বাচনকে মেনে নিতে পারেনি এমনকি বিএনপির নেতারা ওই নির্বাচনে ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। ফলে নির্বাচন কমিশনকে ৩০০ আসনের বানোয়াট ফলাফল বানাতে হয়।

এর মধ্যে দিয়েই ভোটারবিহীন নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় এবং বাংলাদেশ এ নির্বাচনী ব্যবস্থার সবচেয়ে কাল দিন মনে করা হয় ১৫ ফেব্রুয়ারিকে। অবশ্য ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন করে বিএনপি বেশিদিন ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি প্রহসনের সংসদ গঠিত হয় এবং মাত্র তিনদিন সংসদের কার্যক্রম চালিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করার পর বিএনপি ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ১৫ ফেব্রুয়ারি একদিকে যেমন একটি কলঙ্কিত দিন, অন্যদিকে আবার জাগরণের দিন। ঐক্যের মাধ্যমে এ নির্বাচনকে বাংলাদেশের মানুষ প্রতিহত করেছিল আবার এরকম একটি প্রহসনের নির্বাচন করে বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি কলঙ্কের তিলক লেপন করা হয়েছিল।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি