রবিবার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
  • প্রচ্ছদ » Lead 3 » কুমিল্লা: মন্দিরে সংঘবদ্ধ হামলাকারীরা স্থানীয় শিবির নেতাকর্মী, বলছেন স্থানীয়রা



কুমিল্লা: মন্দিরে সংঘবদ্ধ হামলাকারীরা স্থানীয় শিবির নেতাকর্মী, বলছেন স্থানীয়রা


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
17.10.2021

নিউজ ডেস্ক: নানুয়া দীঘির পাড়ের মণ্ডপে হামলার পর কুমিল্লা শহরে মন্দিরে মন্দিরে যারা হামলা চালিয়েছিল, সংঘবদ্ধ হয়েই তারা এসেছিল, যাদের চিনতে না পারলেও এদের দেখতে শিবির নেতাকর্মী মনে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তারা বলছেন, হামলাকারী অনেকের কাঁধে ছিল ব্যাগ। সে ব্যাগে রেললাইনের পাথর নিয়ে এসেছিল তারা। মই আর হাতুড়িও ছিল তাদের সঙ্গে।

দুর্গাপূজার মধ্যে বুধবারের হামলার পর মন্দিরগুলোতে পুলিশ পাহারা বসেছে, সড়কে বিজিবিও রয়েছে টহলে। কিন্তু তারপরও আতঙ্কে কাটেনি।

কুরআনের অবমাননার কথিত অভিযোগে বুধবার সকালে প্রথমে হামলা হয় কুমিল্লা শহরের মধ্যস্থলের নানুয়া দীঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে। এরপর অন্য আরও মণ্ডপেও হামলা হয়।

কুমিল্লা মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিবু প্রসাদ দত্ত বলেন, বুধবার মোট আটটি মন্দিরে হামলা চালানো হয়। তার মধ্যে নানুয়া দীঘির পাড়ের দর্পন সংঘ মন্দির ও চাঁন্দমনি কালীবাড়িতে মূর্তি ভাংচুর হয়।

নানুয়া দীঘি থেকে এক কিলোমিটারের মতো দূরে শহরের চকবাজার এলাকায় (কাপুড়িয়াপট্টি) শত বছরের পুরনো চাঁন্দমনি রক্ষাকালী মন্দির।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরের ভেতরে দুর্গা প্রতিমা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখানে-ওখানে ভাঙা চেয়ার, কাচ পড়ে রয়েছে।

মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারাধন চক্রবর্তী বলেন, নানুয়ার দীঘিতে ভাংচুর শেষ হওয়ার আগেই বেলা ১১টার দিকে এই কালী মন্দিরে প্রথম হামলা হয়। এরপর হামলা হয় আরও দুই দফায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মন্দিরের বিশাল লোহার ফটকটি প্রথম দুই দফা হামলা ঠেকিয়ে দিয়েছিল। তৃতীয় দফায় বেলা ৩টার পরে হামলাকারীরা মই নিয়ে এসে লোহার ফটক টপকে মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোকে। এরপর হাতুড়ি দিয়ে তালা ভেঙে মন্দিরের ফটকটি খুলে দিলে কয়েকশ হামলাকারী ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়।

হামলাকারীদের মারধরে আহত হন ঢাকী রবি চন্দ্র বাদ্যকার। তিনি বলেন, বেলা ১১টা থেকেই মন্দিরে হামলার চেষ্টা করছিল কিছু লোকজন। থেমে থেমে চলছিল ঢিলাঢিলি।

“বেলা ৩টার দিকে মই নিয়ে এসে তারা গেইট টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর হাতুড়ি দিয়ে প্রথমে গেটের তালা ভেঙে অন্যদের ঢোকায়।”

মন্দির প্রাঙ্গণেই বিরস মুখে বসে ছিলেন যুবক বয়সী অধীর সাহা। মন্দিরের পাশেই তার বাড়ি। তিনি বলেন, তার জীবনে এর আগে কখনও এমন ঘটনা দেখেননি।

এই এলাকাতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও হামলাকারী ‘একজনকেও চিনতে পারেননি’ বলে জানান অধীর।

“ওরা যেভাবে মই, হাতুড়ি, পেট্রোল নিয়ে এসেছিল, তা কল্পনাতীত। বোঝাই যায় খুবই পরিকল্পনামাফিক ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে।”

মন্দিরের ফটকটি ১০ ফুট উঁচু, স্টিলের তৈরি। ওই ফটক পার হতে বাঁশের মই কোত্থেকে এসেছিল, সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি স্থানীয়রা।

নানুয়া দীঘির পাড় থেকে এক কিলোমিটারের কম দুরত্বে গাছতলা কালী মন্দির। সেখানকার হিন্দুরাও জানান, সেখানে হামলায়ও তাদের এলাকার কেউ ছিল না।

এই মন্দির কমিটির সহসভাপতি সজল কুমার চন্দ বলেন, নানুয়া দীঘিরমন্দিরে হামলার খবর পেয়েই তাদের এলাকার তরুণেরা একত্রিত হয়ে অবস্থান নেয় এই মন্দিরে। মন্দির ভবনের দরজায় তালা মেরে দেওয়া হয়। পাশের শিব মন্দিরেও তালা দেওয়া হয়।

বেলা ২টার দিকে কয়েকশ লোক একযোগে এসে হামলা চালায় জানিয়ে সজল বলেন, “এরা কেউ এই এলাকার না। তাদের মধ্যে কিশোর থেকে শুরু করে ২৫-৩০ বছরের যুবকরাও ছিল।

“তাদের অনেকের কাঁধে স্কুলব্যাগ বা হাতে বাজারের ব্যাগ ছিল। ওই ব্যাগগুলো থেকে তারা সাদাটে বেলে পাথর (রেললাইনের পাথর) বের করে বৃষ্টির মতো মন্দিরের দিকে ছুড়েছে।”

কুমিল্লা শহরের মধ্য দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। সেই লাইন থেকেই পাথর সংগ্রহ হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সজল বলেন, এলাকার তরুণরা প্রতিরোধ করতে দাঁড়ালেও হামলাকারীরা সংখ্যায় অনেক হওয়ায় তাদের সামনে টিকতে পারেনি।

হামলাকারীরা মন্দির প্রাঙ্গণে সাজসজ্জার সব উপকরণ লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। বাতি, ব্যানার ভেঙেচুরে দিয়ে যায়।

ওই মন্দিরের সদস্য রবি মজুমদার তখন পাশের শিব মন্দিরে তালা মারছিলেন। সেখানেই হামলার মুখে পড়েন তিনি। তার হাত, পিঠ, কোমরে লাঠির আঘাতে কালসিটে পড়ে গেছে।

কুমিল্লার কাপড়িয়াপট্টি শ্রী শ্রী চান্দমনি রক্ষাকালী মন্দিরে হামলাকারীদের মারধরে আহত একজন। সজল বলেন, “তাদের (হামলাকারী) হাতে লাঠি-সোঁটা ছাড়াও বিভিন্ন আকারের ধারাল অস্ত্রও ছিল।”

মন্দিরের পর পাশের পাস্টারপাড়ায় হিন্দুদের কয়েকটি বাড়িতেও হামলা হয়। টিনের বেড়া কুপিয়ে কাটার চেষ্টা চলে। এসময় পাড়ার লোকজনের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা পিছু হটে বলে জানান সজল।

মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা শিল্পী চক্রবর্তী বলেন, “পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে প্রতিরোধ করেছে বলে রক্ষা। তবে বাড়ির ছোটরা খুবই ভয় পেয়েছে।”

শিল্পী বলেন, ভয়ে তার ১২ বছরের ছেলে এখন ঘর থেকেই বের হতে চাইছে না।

আতঙ্কে বুধবার রাতে এই এলাকার ২৬টি হিন্দু পরিবারের কেউই এলাকায় ছিলেন না। শহরের আশপাশে যার যার আত্মীয়ের বাড়িতে রাত কাটিয়েছেন।

হামলার পর শহরের মন্দিরে মন্দিরে পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। তবে আতঙ্ক এখনও কাটেনি।

নানুয়া দীঘির মণ্ডপ পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ষড়যন্ত্রমূলকভাবে উস্কানি দিয়ে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে।”

তবে কারা এসবে জড়িত ছিল, তাদের এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

ডিআইজি আনোয়ার বলেন, “যারা এর সঙ্গে যুক্ত পুলিশ, অবশ্যই তাদের খুঁজে বের করবে।”

এর মধ্যেই উস্কানি ও হামলার অভিযোগে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৪৩ জনকে আটকের কথা জানান তিনি।

নানুয়া দীঘির পাড়ে হামলায় ফেইসবুকে ভিডিও পোস্ট দিয়ে ধারা বর্ণনা করা ফায়েজ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান আনোয়ার।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি