রবিবার ৫ ডিসেম্বর ২০২১



ভোট কেন্দ্রীক জোটে বিভক্ত বিএনপি


বাংলা নিউজ ব্যাংক :
02.11.2021

বিএনপি মহাসচিব জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে বলেছেন, ‘সরকার পতন আন্দোলনে বিএনপি তো আছেই। এর সঙ্গে সব রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সামাজিক, পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়েই জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, জনগণের একটা সংসদ তৈরি করতে হবে’। জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক তিনি দলীয় ফোরামসহ প্রায় সব সময়ই দেন। একইসঙ্গে বিএনপি দলীয় সিনিয়র নেতারাও একইভাবে ঐক্যের কথা বলেন।

দলীয় সাংগঠনিক শক্তি হ্রাসের জন্যেই নয়, যে কোনো আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। এই পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনই এককভাবে সফল হয়নি। অন্যদিকে একটি আদর্শকে সামনে রেখে কিছু মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়েই একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম। সুতরাং ঐক্য আর রাজনীতি একে অন্যের ছায়ার মতো। এটা গণতান্ত্রিক রাজনীতি হোক কিংবা স্বৈরশাসন হোক, দল গঠন থেকে শুরু করে অভিষ্ট্য লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই। একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী এবং প্রধান সামরিক শাসক পদে থেকে রাজনীতি করতে গিয়ে জিয়াউর রহমানকেও বাম-ডান-মধ্যপন্থি সুবিধাবাদীদের একত্রিত করে রাজনীতিতে নামতে হয়েছিল। সামরিক শাসক হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় খরচে দেশব্যাপী ঘুরে ঘুরে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দল ঘোষণার আগেই তিনি সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠীকে ক্ষমতার সুবিধা প্রদান করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য তাকে অগণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করতেও ঐক্যকে বেছে নিতে হয়েছিল। আবারও বলতে হয় একটি দল মানেই সংঘবদ্ধ একটি শক্তি।

সেই সুবাদে বিএনপি নেতার এই আহ্বান তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু মুখে বলা আর কার্যক্রমে প্রতিফলিত হওয়ার একটি বিষয় আছে। তিনি যে মুহূর্তে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন তার আগের সপ্তাহেই খেলাফত মজলিশ তাদের জোট থেকে ছিটকে পড়েছে। তাদের জোটছাড়ার কারণগুলো বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। তারা বলেছে, ২০ দলীয় জোট দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। বড় দল হিসেবে শরিক কোনো দলকেই মূল্যায়ন করেনি তারা। আর এই অভিযোগ শুধু খেলাফত মজলিশেরই নয়। যে কয়েকটি দল এখনও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে, তারাও কিন্তু একই অভিযোগ উত্থাপন করছে।

পার্থক্য হচ্ছে কিছু দল জোট ত্যাগ করেছে এবং হাতেগোনা নামসর্বস্ব কিছু দল এখনও বিএনপির ছায়ায় অবস্থান করছে। জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে হতাশা এবং নানা অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় কয়েকদিন আগে বিএনপি ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে ২০ দলীয় জোট সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সামনেই বিভিন্ন নেতা স্পষ্টত জোট নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। গত নির্বাচনকালে ড. কামাল হোসেনকে নেতা বানিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্যর্থ হওয়ার উদাহরণও দিয়েছেন নেতৃবৃন্দ, তাদের মধ্যে স্পষ্টত ক্ষোভ দেখা গেছে, ওই জোট গঠনের সিদ্ধান্ত বিষয়ে। তারা স্পষ্টত বলেছেন, বিএনপি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে গিয়ে নিজ দলের সর্বনাশ করেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তাতে মনে করা যায় বিএনপির ভিতরে একটি বড় অংশ চায় না জামায়াতে ইসলামী তাদের জোটে থাকুক। তার মানে হচ্ছে-বিএনপি দলীয়ভাবে জামায়াতসহ জোট কিংবা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জোট কোনোটারই পক্ষে নেই।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। করোনাকালে বিএনপি উন্মুক্তস্থানে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ করেনি সঙ্গত কারণেই। কিন্তু তাদের ঘরোয়া সভা অনুষ্ঠান বহাল ছিলো। সেসব সভা-সমাবেশগুলোতে বিএনপি ছাড়া জোটের শরিকদলগুলোর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এখনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এমনকি জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলো যখন বিএনপির নিস্ক্রিয়তা এবং শরিক দলগুলোকে অবমূল্যায়ন বিষয়ে সমালোচনা করছে তখনও কোনো শরিক দলকে তারা কাছে টানেনি কিংবা নিদেনপক্ষে হাই-হ্যালো পর্যন্ত করেনি। কিন্তু জোটের রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হওয়ার পরিণতির জন্য সরকারের ওপর দায় চাপাতে ভুল করেনি। সর্বশেষ খেলাফতে মজলিশের জোটত্যাগের ঘোষণার জন্য তারা সরকারের চাপ আছে বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছে।

৭ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আরেক ধাপ বাড়িয়ে বলেছেন, ইসলামী দলগুলোর নেতারা অধিকাংশই মসজিদ কিংবা মাদ্রাসার ইমাম কিংবা শিক্ষক। তারা তাদের চাকরির রক্ষার্থে সরকারকে খুশি রাখার জন্য জোট ছেড়েছে। তিনি হয়তো এই কথা বলার সময় ভুলে গিয়েছিলেন, মসজিদের ইমাম নিয়োগ কিংবা তাদের চাকরি রাখা না রাখার ওপর সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। স্থানীয়ভাবে মুসুল্লিদের মাধ্যমে মসজিদগুলো পরিচালনা হয়ে থাকে। অন্যদিকে মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারের আওতায় আনার অনেক চেষ্টা করেও সরকার তা করতে পারেনি। বরং কওমি মাদ্রাসাগুলো স্পষ্টতই বলেছে, তারা কোনোভাবেই সরকারি নিয়ন্ত্রণকে মেনে নেবে না। কিছু মাদ্রাসা আছে সরকারের নিয়ন্ত্রণে যার সংখ্যা সামান্যই বলা যায়। তাই বলা যায়, যেসব ইসলামী দল জোট ছেড়েছে তারা সরকারের কোনো চাপে নয়, তাদের দলীয় সিদ্ধান্তেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

একদিকে জোটভাঙ্গা রোধ করতে কোনো পদক্ষেপ না নেয়া অন্যদিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেওয়ার মধ্যে নতুন ভাবনাই প্রকাশ পায়। তাহলে কি তারা নতুন জোটের চিন্তা করতে শুরু করেছে? এক্ষেত্রে ভোটের হিসাব ও প্রাপ্তির বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। গত নির্বাচনে বিএনপি দুটি জোট মাধ্যমে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল। একটি জোটে ধর্মাশ্রয়ী কিছু রাজনৈতিক দল ছিল। যার মধ্যে ছিল জামায়াতে ইসলামীর মতো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তাদের সঙ্গে ছিলো চরম সাম্প্রদায়িক কিছু ক্ষুদ্র দল। এই জোটকে টিকিয়ে রেখে নির্বাচনী মাঠে নামার কারণ হিসেবে বিএনপি ভোট ব্যাংকের কথা বিবেচনা করেছিল। তারা মনে করেছিল জামায়াতে ইসলামীসহ ক্ষুদ্র কিছু ধর্মাশ্রয়ী দলের ভোট আছে ৫%-থেকে ৬%। তারা মনে করেছিল যেহেতু জামায়াতে ইসলামী আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না তাই জোটভুক্ত করলে তারা সেই ভোটগুলো পেয়ে যাবে। নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর কিছু নেতাকে ধানের শীষ উপহার দিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার সুযোগ করে দেওয়াটাও সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নতর দেখা গেছে। এইসব দল কার্যত মাঠেই অনুপস্থিত ছিল। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।

নির্বাচন পরবর্তীকালে ছোট দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম বলতে গেলে নেই। সেটা যে শুধু করোনার কারণে হয়েছে তা নয়। তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতাই এর জন্য দায়ী। এমতাবস্থায় বিএনপি যে ওই দলগুলোর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে তা বোঝা যায়। কিন্তু সরকারবিরোধী আন্দোলন করা কিংবা আগামী নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের জোটবদ্ধ হওয়ার তাগাদা থাকতেই পারে। ২০ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো একে একে জোট ছাড়া এবং বিএনপিও তাদের গুরুত্ব না দেওয়ার পর মনে করা যেতে পারে, তাদের জোটচিন্তায় নতুন কিছু পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই জোটে তাহলে কারা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? গত নির্বাচনকালে বিএনপি বাম দলগুলোর সঙ্গেও বৈঠক আলোচনা করেছিল। তখন এই বাম দলগুলো বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো উগ্রবাদে বিশ্বাসী দলকে সঙ্গে নিয়ে জোটভুক্ত হতে রাজি হয়নি। এখন যেহেতু ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো একে একে জোট ছাড়ছে, তাই মনে করা যায়, হয়তো ক্ষুদ্র কিছু দল বিএনপির ডাকে সাড়া দিতেও পারে। কিন্তু যতক্ষণ জামায়াতের মতো চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী দল জোটে থাকবে ততক্ষণ বামদলগুলো জোটভুক্ত হবে এমনটা চিন্তা করা যায় না।

তবে করোনার প্রভাব কমতে শুরু করা এবং বিএনপি রাজনীতিতে ফিরে আসা দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হবে কার সঙ্গে। কট্টর ডান নাকি বামদের জায়গা হবে আগামী নির্বাচনী জোটে। নাকি কিছু নেতার ভাষ্য অনুযায়ী বিএনপি একাই লড়াইয়ের মাঠে থাকবে? প্রশ্নের জবাব পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি