বহিষ্কারের খবরে ‘জালালি খতম’ পড়ানোর কথা বললেন তৈমুর

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের পর বড় সিদ্ধান্ত নিল বিএনপি। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী দুই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তৈমুর আলম খন্দকার ও এটিএম কামালকে হঠাৎ দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অবাক করেছে অনেককে।

এ দুই নেতার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের চিঠি এখনও পাননি তৈমুর ও কামাল। তবে তারা দলের বার্তা পেয়ে গেছেন মিডিয়ার মাধ্যমে।

দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দীর্ঘদিন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলার আহবায়ক পদে থাকা তৈমুর। এটিএম কামালও দলের সিদ্ধান্তের কথা জেনেছেন।

এ প্রসঙ্গে তৈমুর আলম খন্দকার মঙ্গলবার বলেন, বহিষ্কারের চিঠি এখনও পাইনি। বহিষ্কার করে থাকলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

এর আগে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নাসিকে মেয়র পদে অংশ নেওয়ায় তৈমুরকে দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, জেলা বিএনপির আহবায়ক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তখনও তৈমুর আলহামদুলিল্লাহ বলেছিলেন।

দলের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে যে তৈমুর কিছুটা অবাক হয়েছেন, সেটি বোঝা গেছে বিভিন্ন মিডিয়াকে দেওয়া বহিষ্কারপরবর্তী তার প্রতিক্রিয়ায়। অভিমানী তৈমুর শবিনা ও জালালি খতম পড়ানোর কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে বড় দুটি রাজনৈতিক দলে (বিএনপি-আওয়ামী লীগ) কমিটি ভাঙা ও বহিষ্কারের মড়ক লেগে গেছে। এই বড় দুই দলের ত্যাগী ও নিবেদিত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে শবিনা খতম পড়াইতে হবে। করোনার মতো রাজনৈতিক মহামারি লেগে গেছে নারায়ণগঞ্জে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য দুদলের নেতাকর্মীদেরই জালালি খতম পড়াতে হবে।

দলীয় প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে লড়ে ৯০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন তৈমুর আলম খন্দকার। দল থেকে তেমন সহায়তা না পেয়ে ব্যক্তি ইমেজে নিজে লড়ে এত ভোট পাওয়ার পরও বিএনপির এমন সিদ্ধান্তে কষ্ট পেয়েছেন বর্ষীয়ান এ নেতা।

বহিষ্কারের পর তিনি বলেন, দলের একজন নিবেদিত কর্মী হয়ে এমন পুরস্কার পেতে হবে এটি জাতি বিবেচনা করবে। দেশের রাজনীতিতে যে মহামারি চলছে, এটিই তার নমুনা।

জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৈমুর আরও বলেন, আমি মনে করি, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটা সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আমাকে জনগণের জন্য মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন আমি গণমানুষের তৈমুর, গণমানুষের কাছে ফিরে যাব।

গত রোববার ভোট শেষে তৈমুর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তৈমুর আলম খন্দকারের পদপদবি লাগে না। বিএনপি রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। এটি নিয়ে মরতে চাই। তিনি এও জানিয়েছিলেন যে, পদ ফিরে পেতে তিনি আবেদন করবেন না। তার দুদিন পরই বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হলেন তৈমুর।

এদিকে তৈমুরকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছিল। ভোটের মাঠে দলের একটি বড় অংশ তার বিরোধিতা করেছে। দল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর শুরুতেই ভোটের মাঠে ধাক্কা খান তৈমুর।

শুধু অব্যাহতি নয়, দলের কেন্দ্রীয় একটি অংশ স্থানীয় নেতাকর্মীদের তৈমুরের পক্ষে মাঠে না নামার নির্দেশ দেন। নামলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেও জানানো হয়। কেন্দ্রের এমন কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় পদধারী অনেক নেতা শুরু থেকেই তৈমুরকে এড়িয়ে চলেন।

এ ছাড়া স্থানীয় রাজনীতিতে তৈমুরবিরোধী বড় একটি অংশ রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন এবং বন্দরের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম, গত নির্বাচনে ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনসহ জেলার অনেক নেতাই তৈমুরের সঙ্গে ছিলেন না।

বরং তারা তৈমুরের বিপক্ষে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা ভোটের ফল বিশ্লেষণেও দেখা যায়। গিয়াসউদ্দিন ও আবুল কালামের ছেলে কাউন্সিলর পদে জয়লাভ করলেও ওই দুটি ওয়ার্ডে তৈমুর আলম নৌকার চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। এসব হিসাব-নিকাশ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যেই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানতে পারেন তৈমুর।

একই সঙ্গে তৈমুর আলমের নির্বাচনী প্রধান এজেন্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকেও প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার স্থলে মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আব্দুস সবুর খান সেন্টুকে।

সোমবার দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বহিষ্কারের চিঠি মঙ্গলবার তাদের দুজনের কাছে পৌঁছানো হয়।

বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার ও এটিএম কামালকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দলে থেকে সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড বলে গণ্য হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদধারী কেউ নির্বাচন করলে তাকে বহিষ্কার করা হবে।

মঙ্গলবার রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত চিঠিতে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে বহিষ্কার প্রসঙ্গে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির গঠনতন্ত্র মোতাবেক দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো।

চিঠির অনুলিপি ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিবকেও দেওয়া হয়। বহিষ্কারের কারণ হিসাবে একই অভিযোগের কথা বলা হয়েছে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালের চিঠিতেও।

এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার রাতে এটিএম কামাল বলেন, বহিষ্কারের কথা শুনেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি পাইনি। তবে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আমি শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করেছি— এ কারণে হাইকমান্ড চাইলে আমাকে বহিষ্কার করতে পারেন। তবে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের একজন কর্মী হিসাবে আমি রাজনীতি করতে চাই।

রোববার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারদলীয় মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী নৌকা প্রতীকে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার হাতি প্রতীকে পান ৯২ হাজার ৫৬২ ভোট। অর্থাৎ ৬৬ হাজার ৫৩৫ ভোট বেশি পেয়ে তৈমুর আলম খন্দকারকে পরাজিত করেন আইভী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.