শ্রীলঙ্কা ইস্যুতে সরকার পতনের ‘দিবাস্বপ্নে’ বিএনপি-জামায়াত!

বিএনপি-জামায়াত

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশেও শ্রীলঙ্কার মতো সরকার পতনের অবান্তর সম্ভাবনা দেখছে দেশবিরোধী অপশক্তি। যারা বিরোধীতা করেছিল এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতায়ও। তারাই এখন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লোভে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ধ্বস নামবে, বিপর্যস্ত অর্থনীতির ফলে সরকার পতনের ঘটনা ঘটবে; আর তারা ক্ষমতার গদি দখল করবে।

অথচ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি সূচকের হিসাবে শ্রীলঙ্কার চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। আমদানিনির্ভর শ্রীলঙ্কার রপ্তানি পণ্য মূলত তিনটি- তৈরি পোশাক, চা ও রাবার। আর বাংলাদেশ পোশাকের পর হোম টেক্সটাইল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে পৌঁছেছে।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও শতকোটি ডলার ছুঁই ছুঁই করছে। চলতি ২০২১–২২ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) পণ্য রপ্তানিতে বেশ ভালো করেছে বাংলাদেশ। তাতে দুই মাস বাকি থাকতেই চলতি অর্থবছরের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তার কাছাকাছি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে পণ্য রপ্তানি চলতি অর্থবছর শেষে ৫ হাজার কোটি ডলারের মাইলফলকে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ এবছর।

এছাড়া প্রবাসী আয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আয় ও ব্যয় বাড়ার সুযোগে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, এমনকি বিদেশি সাহায্যের পাইপলাইনের অবস্থা বেশ ভালো হওয়ায় বাংলাদেশের নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি হওয়ার সুযোগ নেই।

অনেকে মনে করেন, ঋণের ফাঁদ, খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ভুল নীতি, ভুল প্রকল্প বাছাই এবং দুর্নীতির কারণেই শ্রীলঙ্কা আজকের এই অবস্থানে।

কিন্তু শ্রীলঙ্কার আজকের দুরবস্থার জন্য ২০১৯ সালের দুটি ঘটনাই মূলত দায়ী। ওই বছর কলম্বোয় তিনটি হোটেল ও তিনটি গির্জায় বোমা বিস্ফোরণের পর পর্যটন খাতে ধ্বস নামে। শ্রীলঙ্কার জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশ। তাতে করে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ বাড়ে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটান প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে নিজেই। এক ধাক্কায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য করেন। একই সঙ্গে ২ শতাংশ হারের জাতীয় উন্নয়ন কর এবং যত আয় তত কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। এর প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়ে। এক বছরেই দেশটির ভ্যাট আদায় কমে যায় প্রায় ৫০ শতাংশ।

এর পরপরই শুরু হয় কোভিড সংক্রমণ। পরের দুই বছরে প্রবাসী আয়, পর্যটন, রপ্তানি সবকিছুই কমে যায়। কোভিডে বিশ্বের সব দেশের সরকারই খরচ বাড়িয়েছে, অর্থনীতিতে দিতে হয়েছে প্রণোদনা। শ্রীলঙ্কার বাজেটে ব্যয় বাড়াতে হয়েছে, অথচ আয় অনেক কমে যায়। এরমধ্যে রাসায়নিক সার আমদানি নিষিদ্ধ করে দেশটির সরকার।

করোনার দুই বছরে বাংলাদেশের মতো বেশির ভাগ দেশ টিকে গেছে কৃষি খাতের কারণে। উৎপাদন ভালো হওয়ায় খাদ্যসংকট হয়নি। ব্যতিক্রম শ্রীলঙ্কা। রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধের ফলে ফসল উৎপাদন কমে যায়। এসব কারণেই শ্রীলঙ্কা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আর এসবের কোনোটিই ঘটেনি বাংলাদেশে, ঘটবেও না কোনোদিন।

এদিকে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর বলেন, একটি নির্দিষ্ট মহল আমাদের এই সুন্দর দক্ষিণ এশীয় বন্ধু রাষ্ট্রের দুর্দশাকে পুঁজি করে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা নেই সে দাবি আমি করব না। কিন্তু আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিমত্তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ যে নেই সে কথা তো মানতেই হবে। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশ ধ্বংসস্তূপ থেকে সমৃদ্ধির পথেই হেঁটে চলেছে।

বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি সূচকের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্ব আর্থিক মন্দা এবং সর্বশেষ করোনাকাল পেরিয়ে সাহসের সঙ্গেই সম্ভাবনার পথে হাঁটছে। চ্যালেঞ্জ নিশ্চয় আছে। তবে সম্ভাবনার পাল্লাই ভারী। দুর্ভাগ্যবশত শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে সম্ভাবনা উবে গেছে। চ্যালেঞ্জ তীব্র থেকে তীবতর হচ্ছে। তাই এ কথা শুরুতেই মেনে নেওয়া ভালো যে এই দুই দেশের বিভিন্ন শক্তি ও দুর্বলতাসহ প্রবৃদ্ধির ভিন্ন ভিন্ন গতিপথ রয়েছে। সে কারণেই দু’দেশকে এক পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.