বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বিবিসি, সতর্ক থাকুন

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

নিউজ ডেস্ক: ২০১৮ সালের ১২ মে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হই আমরা। তবুও থেমে নেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প নিয়ে দেশবিরোধী অপশক্তিসহ আন্তর্জাতিক কুচক্রীমহলের অপপ্রচার। এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে বিবিসি বাংলার একটি বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন। যার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে হেয় করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। অথচ বিবিসি বাংলার এই প্রতিবেদনটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হিসেবেই উল্লেখ করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিয়ে শনিবার (১৪ মে) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি বাংলা। প্রতিবেদনটিকে বিতর্কিত উল্লেখ করে সময় টিভির সম্প্রচার ও আইটি প্রধান সালাউদ্দিন সেলিম একটি গবেষণাধর্মী ও যৌক্তিক অভিমত প্রকাশ করেছেন। সালাউদ্দিন সেলিমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন পুরোপুরিভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বাংলা নিউজ ব্যাংকের পাঠকদের উদ্দেশ্যে এই আইটি বিশেষজ্ঞের পুরো লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

পাল্টা অভিমত: BBC বাংলা প্রতিবেদনের

শিরোনামটি এমন Controversial না দিলেও পারতো বিবিসি বাংলার মতো এমন সনামধন্য একটি মিডিয়া। কারণ গত ৩ বছরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কম করে হলেও ২৯০ কোটি টাকা ইনকাম করার কথা। যদিও আমি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কর্তৃপক্ষের কেউ না তবে একজন ব্যবহারকারী। আর এই হিসেবটি করার জন্য www.lyngsat.com এই ওয়েবসাইটে গেলেই কিছুটা আন্দাজ করা সম্ভব। প্রতিবেদকের উচিত ছিল আরও একটু স্ট্যাডি করা।

একটি সাধারণ হিসেব করে দেখাই ব্যাপারটি। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে দেশিয় সকল টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচারের মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিকভাবে সেবা প্রদান শুরু হয়। অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর ধরে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ইনকাম করা শুরু করেছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার করছে এমন টিভি চ্যানেলের সংখ্যা প্রায় ৪৪টি (কিছু প্রবাসী চ্যানেলসহ)। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দুইটি ভাগে ফ্রিকোয়েন্সী ভাড়া দিয়ে থাকে: একটি হলো ‘ডেডিকেটেড ফ্রিকোয়েন্সী (‘SCPC’ নামে পরিচিত) অন্যটি ‘শেয়ার ব্যান্ডইউথ (‘MCPC’নামে পরিচিত)। এই ফ্রিকোয়েন্সীর আবার দুইটি ব্যান্ড রয়েছে তাহলো C-Band এবং Ku-Band।

C-Band এর হিসেব:

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ডেডিকেটেড ফ্রিকোয়েন্সী ব্যবহারকারী রয়েছে প্রায় ৭টি টিভি চ্যানেল, তারা প্রতি মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সীর জন্য প্রদান করে থাকেন টাকায় ২,৯৫,০০০ এবং প্রতিটি ডেডিকেটেড ফ্রিকোয়েন্সী ব্যবহারকারীরা (প্রতিটি চ্যানেল) কমপক্ষে ৬ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সী ব্যবহার করে থাকেন অর্থাৎ ডেডিকেটেড ফ্রিকোয়েন্সী ব্যবহারকারী প্রতিটি টিভি চ্যানেল প্রতি মাসে (২৯৫০০০x৬) = ১৭,৭০,০০০ টাকা দিয়ে থাকেন।

অন্যদিকে শেয়ার ব্যান্ডউইথ ব্যবহারকারীর প্রতি ১ এমবিপিএস এর জন্য ১,৯৫,০০০ টাকা প্রদান করেন এবং গড়ে প্রতিটি টিভি চ্যানেল ৬ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করেন। অর্থাৎ শেয়ার ব্যান্ডউইথ ব্যবহারকারী প্রতিটি টিভি চ্যানেল প্রতি মাসে প্রায় (৬x১,৯৫,০০০)= ১১,৭০,০০০ টাকা প্রদান করে থাকেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে C-Band এর ফ্রিকোয়েন্সী বিক্রি করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রতি মাসে ইনকাম হওয়ার কথা প্রায়: ৫ কোটি ৫৪ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা।

Ku-Band এর হিসেব:

বর্তমানে Ku-Band ব্যবহার করছে ‘Akash DTH’ এবং ‘BTV’। এই দুই ব্যবহারকারী প্রায় ১৯৫ মেগাহার্ট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে। প্রতি মেগাহার্টজ Ku-Band এর মূল্য প্রায় ২,১২,৫০০ টাকা । সেই Ku-Band এর ফ্রিকোয়েন্সী বিক্রি করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ইনকাম করার কথা ‘প্রতি মাসে প্রায় ৪ কোটি ১৪ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫শত টাকা’।

সর্বসাকুল্যে হিসেব:

এবার যদি সর্বসাকুল্যে হিসেব কষি, অর্থাৎ সব মিলিয়ে চলমান ৪৪টি টিভি চ্যানেল এ ব্যবহৃত ডেডিকেটেড এবং শেয়ার ব্যান্ডউইথ (C-Band এবং Ku-Band) বিক্রি থেকে প্রতি মাসে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ইনকাম হওয়ার কথা ৯ কোটি ৮ লক্ষ ৬২ হাজার ৫ শত টাকা। প্রতি বছরে ইনকাম হওয়ার কথা ১১৬ কোটি ২৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হওয়া গত আড়াই বছরে ইনকাম হওয়ার কথা ২৯০ কোটি ৫৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা।

লাভের হিসেব:

এখন আসি লাভের হিসেবে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কবে লাভে পৌছাঁবে? বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর আয়ুষ্কাল ১৫ বছর, উৎক্ষেপনের প্রায় ১ বছর পর এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে অর্থাৎ সেই হিসেবে এর বাণিজ্যিক আয়ুষ্কাল ১৪ বছর ।

এর উৎক্ষেপনের খরচ ৩০০০ কোটি টাকা। যদি প্রতি মাসে এর পরিচালনা ব্যয় ধরি ২ কোটি টাকা ধরি তাহলে ১৫ বছরে সেই খরচ দাড়ায় ৩৬০ কোটি টাকা, অন্যান্য আনুসঙ্গিক ধরি আরও ১৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১৫ বছরে উৎক্ষেপন ও পরিচালনা ব্যয়সহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রজেক্ট খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে লাভজনক করতে হলে ৩৫০০ কোটি টাকার উপরে ইনকাম করতে হবে ১৪ বছরের মধ্যে (বাণিজ্যিক ব্যবহার হিসেবে)। তার মানে প্রতি বছরে ইনকাম করতে হবে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বর্তমানে প্রতি বছর ইনকাম করছে প্রায় ১১৬ কোটি যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩৪ কোটি কম আছে।

তাহলে লাভ হবে কীভাবে?

প্রশ্ন থাকতেই পারে, প্রতি বছর যদি ১৩৪ কোটি টাকা লস হয় তাহলে এটি লাভের লক্ষ্যমাত্রায় কীভাবে পৌছাবে? উল্লেখ্য যে, এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের যে পরিমাণ ক্যাপাসিটি পড়ে আছে তার যদি অর্ধেকও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয় তাহলে প্রতি বছর আরও প্রায় ২০০ কোটি টাকার উপরে আয় হওয়ার কথা এবং সেটা সম্ভব হলে আগামী কয়েক বছরেই এটি লাভের লক্ষ্যমাত্রায় পৌছাঁতে পারবে।

এখন প্রশ্ন থাকতে পারে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাস্টমার কি শুধু টিভি চ্যানেলগুলো? উত্তর হবে ‘না’। এর কাস্টমার হতে পারে বিভিন্ন ব্যাংক, আইএসপি, মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানসহ অনেকেই। কারণ যেখানেই নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক কিংবা ইন্টারনেট এর প্রয়োজন আছে সেখানেই হতে পারে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ব্যবহার।

এখানে তুলে ধরা হিসেবগুলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রদত্ত কোন হিসেব নয়। এখানে উল্লেখ হিসেবগুলো বর্তমান ব্যবহাকারীদের ডেটা এবং ইউএস ডলারকে টাকায় কনভার্ট করে করা হয়েছে। এই হিসেব বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের চুড়ান্ত হিসেব এর সাথে সামান্য গড়মিল হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.