কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে জামায়াত

বিএনপি চাইলেই জামায়াতে ইসলামী তাদের সঙ্গ ত্যাগ করবে। ২০-দলীয় জোটে জামায়াতের প্রয়োজন নেই- এ কথা বিএনপিকেই আগে বলতে হবে। তবেই জোট ছেড়ে যাবে যুদ্ধাপরাধীর দায়ে অভিযুক্ত দলটি।

জামায়াত নিজে ২০-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আসবে না। তারা জোট ভাঙার দায় নেবে না। এছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলের বর্তমান নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে শূরা সদস্যরা। তবে নাম কি হবে বা কবে নাগাদ নতুন নাম আসবে- তা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। জামায়াতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

এছাড়া জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৭ ফেব্রুয়ারি দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত তারা রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকবে। মিছিল-মিটিং বা সভা-সমাবেশের মতো কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাবে না। শুধু দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দেবে দলটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা বলেন, জামায়াতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিএনপিকে আমরা ছাড়ব না। তারা যদি মনে করে জোটে আমাদের দরকার নেই, তবেই আমরা সরে যাব।

আমাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সর্বশেষ মজলিশে শূরার বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জানুয়ারির মাঝামাঝি। এ বৈঠক আমার এলাকায় হয়েছে, সেখানে আমিও ছিলাম। সেখানে জোট ছাড়া বা এসব নিয়ে আলোচনা হয়নি।

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ২০-দলীয় জোট তো নির্বাচনী জোট, আন্দোলনের জোট। বিএনপি জোটেই আছে জামায়াত। আমরা তো উপজেলা নির্বাচনে যাচ্ছি না, এটা তো জোটের সিদ্ধান্ত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়ার ব্যাপারে জামায়াতে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। মজলিশে শূরায় এ বিষয়ে কোনো মত আসেনি।

তবে এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী তো একটা দল। তাদের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নেই? যদি তারা বিএনপিকে ত্যাগ করতে চায়, করুক। বিএনপির চাওয়া-না চাওয়ার তো ব্যাপার না। তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত আছে না?

তিনি আরও বলেন, জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী দল। তাদের মতো দলকে বিএনপি কেন আশ্রয় দেবে? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সুতরাং জামায়াতকে জোটে রাখাটা আমি কখনও পছন্দ করিনি, এ কথাটা সব সময় বলে আসছি। আমি বলব, বিএনপি তাদের আশ্রয় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শূরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিস্থিতির কারণে একসঙ্গে এ বৈঠক করতে না পারায়, সারা দেশের ১৩টি অঞ্চলে আলাদাভাবে একইদিনে শূরার সদস্যরা বৈঠক করেন। এরপর লিখিত আকারে তাদের মত কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এ বৈঠকেই উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে মত দেন শূরার সদস্যরা। একই বৈঠকে জামায়াতের বর্তমান নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাবও করেন শূরা সদস্যরা। যুক্তি দেখানো হয়, দলটিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতে পারে। নাম পরিবর্তন করা হলে পরিস্থিতি মোকাবেলা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তবে কোনো কোনো সদস্য দলের নাম বদলের বিপক্ষে প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে, সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

জামায়াতের মজলিশে শূরার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত শূরার বৈঠকে অধিকাংশ সদস্য মত দেন- বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার কারণে সরকার তাদের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন চালাচ্ছে। সাংগঠনিকভাবে প্রায় ১০ বছর ধরে অনেকটা নিষিদ্ধ অবস্থায় আছে। তাদের প্রভাবাধীন আর্থিক ও সেবামূলক অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কাছেও গুরুত্ব হারিয়েছে জামায়াত। জোটে থেকে জামায়াত ইসলামীই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরং জোট ছেড়ে এলে এতটা ক্ষতির সম্মুখীন হতো না। তাই জোট ছেড়ে আসা উচিত বলে অধিকাংশ শূরা সদস্য মতামত দেন। সূত্র জানায়, ৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে তাদের মতামত উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে নেতারা বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকার প্রয়োজনীতা ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত নেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে তারা থাকবেন। তবে আপাতত রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থেকে দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই বৈঠকে। শূরা সদস্যদের মতামত গ্রহণ করে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ওই বৈঠকে।

এ ব্যাপারে দলটির কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, জামায়াতে ইসলামী নিজে জোট থেকে বেরিয়ে আসবে না। জোট ভাঙার এ দায় আমরা নেব কেন? জোটে জামায়াতের প্রয়োজন নেই- এ কথা বিএনপিকেই আগে বলতে হবে। সেক্ষেত্রে জোট থেকে সরে যাবে জামায়াত। আমরা এটা মনে করি, জোটের প্রধান হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি কারাগারে আছেন। এখন যে যাই বলুক না কেন, জোট নেত্রীর কাছ থেকেই জামায়াতকে না রাখার সিদ্ধান্ত আসতে হবে। কারণ তার সঙ্গেই আমাদের নেতারা আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এ জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় আরেক নেতা জানান, তারা ইতিমধ্যে দল গোছানোর কাজ করছেন। সারা দেশের বেশিরভাগ জেলায় জামায়াতের আমীর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই মধ্যে নির্বাচিত আমীররা শপথ গ্রহণ করেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শূরার সদস্যরা জানান, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বেশির ভাগ সদস্য ‘জামায়াতে ইসলামী’ নাম পরিবর্তনের পক্ষে প্রস্তাব করেন। এখন কী নামে আসবে, কবে নাগাদ নতুন নাম নির্ধারণ করা হবে- এসব বিষয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রশ্নে এরই মধ্যে সরকারের তরফে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার করার বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ‘প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে বিচার করা হবে।’

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছি। আইনি পথেই মোকাবেলা করব। তবে আমার মনে হয় না, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেবে। জামায়াত দেশের প্রত্যেকটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে।

জামায়াত প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, জামায়াতকে ছাড়ার ব্যাপারে তো আলোচনা আছেই। ঐক্যফ্রন্ট রেখে তো তাদের রাখা যায় না। জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে গেলে খুশি হব আমরা। বিএনপিরও উচিত হবে না আর জামায়াতকে জোটে যুক্ত রাখা। এক প্রশ্নের জবাবে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, জামায়াত নাম যদি পরিবর্তন করে, তাহলে তো হলই। কিন্তু এই নাম নিয়ে আর কত।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, জামায়াত নতুন নামে আসতে চায় বা না চায়, তাদের প্রথম কাজ লুকোচুরি না করে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া। এরপর নতুন নামে নতুনভাবে রাজনীতি শুরু করা।

প্রায় ২০ বছর আগে ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়তে গিয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট গঠন হয়। একসঙ্গে আন্দোলনের পর এই জোট ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পায় এবং সরকার গঠন করে। শুরুর দিকে চারদলীয় জোটের শরিক ছিল এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামী। একপর্যায়ে এরশাদ চার দল ছেড়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে গেলে জাতীয় পার্টির নেতা নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে দলটির একটি অংশ (যা পরে বিজেপি হয়) চার দলে থেকে যায়। চারদলীয় জোট পরে ১৮ দলীয় জোট এবং যা আরও পরে ২০-দলীয় জোটে রূপান্তরিত হয়।

অষ্টম জাতীয় সংসদ থেকে একাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর একসঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচন করেছে বিএনপি-জামায়াত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে দল দুটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে যাওয়ার পর এই দূরত্ব আরও বেড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও দেখুন

সমাজসেবার আড়ালে যৌনতেষ্টা মেটাচ্ছেন বহুগামী সোনিয়া

Share this… Facebook 0 Twitter Telegram Linkedin নিউজ ডেস্ক: সোনিয়া আক্তার স্মৃতি। সমাজসেবার আড়ালে মিটিয়ে নিচ্ছেন নিজের যৌনতেষ্টা। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ায় তার শয্যাসঙ্গী বেশিরভাগই দলটির নেতারা। তবে যে পুরুষ তাকে তুষ্ট করতে পারে না তার সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিছানায় যান না সোনিয়া। তাই ছাত্রদলের সভাপতি রওনক হাসান শ্রাবণের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় সোনিয়ার। কারণ শ্রাবণ […]

বিস্তারিত

খুনি জিয়ার পাপাচার ও পাকিস্তানপ্রীতি

Share this… Facebook 0 Twitter Telegram Linkedin নিউজ ডেস্ক: পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে দায়ী জিয়াউর রহমান এক সময় প্রেসিডেন্ট সায়েমকে জোরপূর্বক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। এরপর ক্ষমতায় বসে জিয়াউর রহমান তার আসল চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাপরিকল্পনার কথা জানা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাধা দেয়া তো দূরের কথা […]

বিস্তারিত

উত্তপ্ত রাজনীতিতে নিষ্প্রভ নুরের দল

Share this… Facebook 0 Twitter Telegram Linkedin ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল ‘গণঅধিকার পরিষদ’ গঠন করেছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর। গণঅধিকার পরিষদ গঠনের পর রাজনীতিতে নানা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই দল নতুন ধারার সূচনা করবে। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই প্রায় হারিয়ে গেছে নুরের […]

বিস্তারিত