খুনি রক্ষার ইনডেমনিটি আইন পৃথিবীতে নেই

আমাদের দেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে যেমন রয়েছে অনেকগুলো ন্যক্কারজনক অধ্যায়, তেমনি রয়েছে কিছু গৌরবোজ্জ্বল ঘটনাও। স্বভাবতই সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনাগুলো ছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বনন্দিত ভাষণ, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় দিবস।

কলঙ্কিত দিবসগুলোর মধ্যে স্বভাবতই প্রথমটি ছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা, ৩রা নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা, ১৯৭৭ সালে জাপানি বিমান হাইজ্যাকের ছুতা ধরে খুনি জিয়াউর রহমান কর্তৃক বিচারের প্রহসন সাজিয়ে কয়েকশত মুক্তিযোদ্ধা হত্যা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপির শাসন আমলে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা এবং মদদে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ কয়েকজনকে হত্যা ইত্যাদি।

এসব কলঙ্কময়, কৃষ্ণ ঘটনাবলির সঙ্গে যে বিষয়টির উল্লেখ না করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে সেটি ছিল ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামক একটি অবৈধ বিধান, যার দ্বারা ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর খুনিদের, এ খুনের পরিকল্পনাকারী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীদের সব ধরনের বিচারের আওতা থেকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা। একইভাবে আমাদের গৌরবময় দিনগুলোর সঙ্গে সংযোজন করতে হয় ১২ই নভেম্বর, ১৯৯৬ সালের যে দিনটিতে সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইনটি বাতিল করে দেশ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।

কুখ্যাত সে অধ্যাদেশে বলা হয়, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রাতঃকালে সাধিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবর্তনের এবং সামরিক আইন ঘোষণার প্রসঙ্গে বা এরূপ পরিবর্তন এবং ঘোষণার জন্য কোনো পরিকল্পনা প্রস্তুত ও বাস্তবায়ন করতে গিয়ে, বা এরূপ পরিবর্তন এবং ঘোষণার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সম্পন্ন কোনো কাজকর্ম, বিষয় বা ঘটনার জন্য বা কারণে বা প্রসঙ্গে এরূপ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট, ও কোর্ট মার্শালসহ কোনো আদালতের বা কর্তৃপক্ষের সমীপে বা নিকটে বা দ্বারা কোনো মামলা, অভিশংসন বা অন্য আইনগত বা শৃঙ্খলামূলক কার্যধারা গ্রহণযোগ্য হবে না বা গৃহীত হবে না। বর্তমানে যে কোনো প্রতিরক্ষা সার্ভিস সংক্রান্ত যে কোনো আইনের আওতায় রয়েছেন বা কোনো সময়ে আওতায় ছিলেন এমন কোনো ব্যক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত।’

অধ্যাদেশটির ভাষা থেকে পরিষ্কার যে, বন্দুক দিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের এবং নিকট আত্মীয়দের যারা প্রত্যক্ষভাবে হত্যা করেছিল শুধু তাদেরই বিচারের হাত থেকে মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়নি, যারা ওই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিয়েছিল তাদেরও মুক্তির আওতায় আনা হয়েছিল। সে অর্থে ওই কলঙ্কিত অধ্যাদেশে জিয়া এবং মোশতাকসহ অন্যান্যদেরও বিচার মুক্ত রাখার প্রচেষ্টা ছিল, কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যা সংক্রান্ত সব তথ্য-উপাত্ত নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ করছে যে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় মুখ্য ভূমিকায় ছিল জিয়াউর রহমান, মোশতাক এবং তাদের কিছু পোষ্য অনুসারী। অধ্যাদেশের ভাষা এতই সুবিস্তৃত যে অপরাধীদের শুধু আদালতেই নয়, সামরিক ট্রাইব্যুনালে, কোর্ট মার্শালেও বিচার করা যাবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে এমনকি বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যাবে না।

অবৈধভাবে হলেও খুনি মোশতাক তখন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে ছিল বলে, অধ্যাদেশটিতে তারই দস্তক্ষত করতে হয়েছিল। কিন্তু এর পেছনে খুনি জিয়ার হাতও যে ছিল মুখ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না, কেননা ১৫ই আগস্ট এবং তৎপরবর্তী অপঘটনসমূহে যে জিয়াই ছিল মূল কুচক্রী, পরবর্তীতে পাওয়া সব সাক্ষ্য প্রমাণ তা নিশ্চিত করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দায়ে বহু বছর পালিয়ে থাকার পর ধরা পড়া ক্যাপ্টেন মাজেদ তার ফাঁসি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগে বলেছিল, ১৫ আগস্টের সব অপঘটনের মূল খলনায়ক ছিল জিয়া এবং সেদিন বঙ্গভবনে জিয়াকেই দেখা গেছে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে। বস্তুত জিয়ার সিদ্ধান্তক্রমেই মোশতাককে সেদিন রাষ্ট্রপতির পদ প্রদান করা হয়েছিল, কেননা সাংবিধানিকভাবে মোশতাকের তা প্রাপ্য ছিল না, প্রাপ্য ছিল উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের।

কিছুদিন পর নিজেই রাষ্ট্রের প্রধান পদটি দখল করার ভাবনা নিয়েই খুনি জিয়া সবার চোখে ধাঁধা দেয়ার জন্য প্রথমত মোশতাককে সর্বোচ্চ চেয়ারে বসিয়েছিল ৮১ দিনের জন্য। সে সময়ের পুতুল রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পুস্তকও একই কথা বলছে।

এই কৃষ্ণ বিধানটি করা হয়েছিল অধ্যাদেশ আকারে, যা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে গৃহীত না হলে স্বাভাবিকভাবে নিঃশেষিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা যেন না হয়, অর্থাৎ ওই বিচার মুক্তির বিধান যেন চিরস্থায়ী হয়, সে ভাবনা নিয়ে ১৯৭৯ সালে খুনি জিয়াউর রহমান সে সময়ের তথাকথিত সংসদে অধ্যাদেশটিকে শুধু আইনের অপ-মর্যাদাই প্রদান করেনি, বরং এটিকে সংবিধানের অংশে পরিণত করেছিল। জিয়ার পর যথাক্রমে বিচারপতি সাত্তার, এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ার পরেও ওই অধ্যাদেশ/আইনটি রহিত করে বঙ্গবন্ধু খুনি এবং খুনের সাথে জড়িতদের বিচারের ব্যবস্থা করেনি। অর্থাৎ ১৯৭৫-এ ওই অধ্যাদেশ দ্বারা জিয়া-মোশতাকদ্বয় দেশে বিচারহীনতার যে নিকৃষ্ট প্রথার প্রচলন করেছিল, তা এরশাদ এবং খালেদা জিয়াও প্রচলিত রেখেছিলেন।

ওই অধ্যাদেশ এবং আইন করার পেছনে মূল কারণ ছিল এই যে যেহেতু বন্দুকধারী কজন সামরিক কর্মকর্তা জিয়া-মোশতাকের নির্দেশনা এবং মদদপ্রাপ্ত হয়েই বঙ্গবন্ধু হত্যার হলি খেলায় মেতেছিল, তাই জিয়া-মোশতাকসহ এ বন্দুকধারীদের রক্ষা করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। তদুপরি জিয়া-মোশতাক এটাও ভেবেছিল যে বন্দুকধারীদের বিচার হলে স্বভাবতই এটি নিশ্চিত হয়ে যাবে যে তারা জিয়া-মোশতাকের নির্দেশনায়ই বাস্তবায়িত করেছে। জিয়া ও পরবর্তীতে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া এসব বন্দুকধারীর বিচারের হাত থেকে মুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পুরস্কার হিসেবে তাদের প্রত্যেককে পদোন্নতি দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে লোভনীয় কূটনৈতিক পদে প্রতিষ্ঠিত করেছে। খালেদা জিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তাদের পবিত্র সংসদে সদস্য হিসেবে বসার সুযোগ দিয়ে সংসদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করেছে।

গুরুতর অপরাধীদের বিচার মুক্তির জন্য আইন করার কোনো নজির পৃথিবীর কোথাও রয়েছে কিনা, সে বিষয়টি আমাকে বহু বছর ভাবিয়ে তোলায় এটি নিয়ে আমি বেশ কিছু পড়াশুনা করে জেনেছি, রাষ্ট্রনায়ক হত্যা তো দূরের কথা সাধারণ মানুষ হত্যাকারীদের মুক্তির জন্য কোনো আইন জানা ইতিহাস মতে কোথায়ও প্রণীত হয়নি। সে অর্থে আমাদের দেশে জারি করা কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন নজিরবিহীন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রনায়কদের হত্যাকারীদের বিচার করতে কোনো দেশ কখনও দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রাচীন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের হত্যাকারী ব্রুটাসকেও বিচারের জন্য তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাতে কর্তৃপক্ষ বিলম্ব করেনি। ১৮ শতকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন হত্যার দায়ে ৮ জনের বিচার হয়েছিল, যার মধ্যে চারজনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। কথিত আছে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মহাত্মা গান্ধী নাথুরাম গডসকে মাফ করে দিতে বলেছিলেন, কিন্তু মাফ তাকে করা হয়নি, তাকেও ফাঁসির দড়িতে ঝুলে প্রাণ দিতে হয়েছিল। জন কেনেডি, ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধীসহ বহু রাষ্ট্রনায়কের হত্যাকারীর ভাগ্যে একই পরিণতি ঘটেছিল। সব অপরাধীর বিচার হওয়াটাই আইনের শাসনের মূল কথা। আর অপরাধ যদি খুনের বা ওই ধরনের মারাত্মক কিছু হয়, তা হলে তো কথাই নেই। আর খুনের ভিকটিম যদি কোনো রাষ্ট্রনায়ক হন তাহলে পৃথিবীর কোনো দেশেই অপরাধীকে নিস্তার দেয়ার বিধান বা ব্যবস্থা নেই। রাষ্ট্রনায়ক হত্যাকে পৃথিবীর সব দেশেই সর্বোচ্চ অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। এমনকি যুক্তরাজ্য, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই, সেখানেও রাজা/রানিকে হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টার সাজা মৃত্যুদণ্ড।

আজ বিশেষ করে মনে পড়ে প্রয়াত রাজনীতিক আব্দুল মতিন খসরু সাহেবকে যিনি ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে এই কুখ্যাত, বিশ্বনিন্দিত আইনটি বাতিলের জন্য সাফল্যের সঙ্গে প্রস্তাব উত্থাপন করে বঙ্গবন্ধু খুনিদের বিচারের পথের কাঁটা সরিয়ে ছিলেন। সেই সঙ্গে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকেও দেশকে উদ্ধার করতে বাস্তব ভূমিকা রেখেছিলেন।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *